বিশ্বসভ্যতা প্রসংগে কোরআনের খণ্ডিত বর্ণনার কারণ ও তাৎপর্য

“গ্রীক সভ্যতাকে বলা হয় শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও মননে একটি সমৃদ্ধ সভ্যতা। এটি কোরআন নাযিলের আগের সভ্যতা। মিশরীয়, সিন্ধু, মেসোপটেমীয়, চৈনিক, এইসব সভ্যতাও কোরআন আসার আগের। কোরআন যদি সকল জ্ঞান ও সভ্যতার উৎস ও মানদণ্ড হয়ে থাকে তাহলে এসব সভ্যতা কি সভ্যতা নয়? অথবা…

এ বিষয়ে আপনার মতামত চাই।”

এই পাঠককে আমি যা বলেছি, ভাবছি, এটি আপনাদেরকেও বলি। এ ধরনের সিলি বিষয়েও মানুষের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বেশ আগে আমার এক নিষ্ঠাবান ইসলামপন্থী সহকর্মীও আমাকে অনুরূপ প্রশ্ন করেছিলেন। আমি যেহেতু দর্শনের লোক এবং এগুলো own করি আর প্রচার করি, তাই তিনি আমাকে একদিন বললেন, ‘স্যার, আপনারা যে সক্রেটিস, প্লাটো, এরিস্টটলকে এত মূল্যায়ন করেন, কই তাদের কোনো রেফারেন্স তো কোরআনে পাওয়া যায় না। আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সভ্যতা তো এদের ভাবনা-চিন্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।’

আমার উক্ত সহকর্মীকেও আমি নিম্নোক্ত ধরনের উত্তর দিয়েছিলাম।

কোরআন বলতে আমরা যদি নবী মুহাম্মদের (সা) উপর নাযিলকৃত আসমানী কিতাবকেই বুঝি, তাহলে এর পূর্বে আসা সভ্যতাগুলো যে কোরআননির্ভর নয়; বরং কোরআনের হেদায়েত ছাড়াই তারা সভ্যতাগত অগ্রগতি ও উৎকর্ষতা লাভ করতে পেরেছে, এটি অনস্বীকার্য।

সমস্যা হলো, কোরআন নিজেই বলছে, এই কোরআন ছিল লাওহে মাহফুজে। তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুরসহ সব ‘আসমানী গ্রন্থ’ এই মূল উৎস হতেই নাযিলকৃত। কোরআন নিজেই বলছে, এই কোরআন নাযিল হওয়ার পূর্ব থেকেই, বস্তুত মানব জাতির শুরু থেকেই সভ্যতা গড়ে তোলা এবং সেটাতে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য, প্রতিটা যুগে প্রতিটা কালে নবী-রাসূলগণ এসেছেন। কোরআনের অনুরূপ হেদায়েতের গ্রন্থ মানুষকে দেয়া হয়েছে। বরং, বলা যায়, কোরআন হলো হেদায়েতের জন্য প্রেরিত গ্রন্থসমূহের ফাইনাল এডিশন।

একটা ‘আসমানী গ্রন্থ’ যখন নাযিল হবে, সেটি কোনো না কোনো পার্টিকুলার জায়গাতেই তো নাযিল হবে। আকাশ থেকে একটা মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবী পৃষ্টে পতিত হলেও সেটি তো পৃথিবীর নির্দিষ্ট কোনো জায়গাতেই পড়বে, তাই না?

বেশ কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ‘ভাবনার স্থানিকতা ও আন্তর্জাতিকতা’ শিরোনামে একটা সেমিনার আয়োজন করেছিল। সেখানে কী আলোচনা হয়েছে সেটাকে স্কিপ করে আমরা যদি শিরোনামটির দিকে লক্ষ করি তাহলে বুঝতে পারবো, ভাবনা ও মতাদর্শ মাত্রই কোনো না কোনো ব্যক্তি, বিশেষ কোনো কালে ও নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে সর্বপ্রথম ইন্ট্রুডিউস করেন। এরপরে তা ক্রমান্বয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

ইসলামের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।

তৎকালীন আরবের লোকদের কাছে কোরআন নাজিল হয়েছে। এ কারণে তাদের ভাষায় ও তাদের জ্ঞাত ইতিহাসের বিষয়গুলোই শুধু কোরআনে উল্লেখিত হয়েছে। যদিও কোরআন কনফার্ম করেছে যে কোরআনে উল্লেখিত নবী-রাসূলগণ ছাড়াও যুগে যুগে সব দেশে সব কালে মানুষকে সভ্যতার দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য নবী-রাসূলগণ প্রেরিত হয়েছেন।

প্রাচীন সেই সভ্যতাগুলো এবং সেগুলোর নানা ধরনের স্পেসিফিক উপাদান সম্বন্ধে জানার উপায়গুলো ইতিহাসের গবেষণা-সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীনকালের বিষয় হওয়ার কারণে সেগুলো সম্পর্কে প্রচলিত বর্ণনাগুলোর অথেন্টিসিটিও প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদুপরি আরবের লোকেরা সেইসব দূরবর্তী ও ‘অপর’ সভ্যতাসমূহের সাথে পরিচিতও ছিল না। এ ধরনেরই নানাবিধ কারণে কোরআনের মধ্যে মানবসভ্যতার একটা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আসেনি।

তার চেয়ে বড় কথা হলো, কোরআন এসেছে হেদায়েত দেওয়ার জন্য; ইতিহাস বর্ণনা করার জন্য নয়। হেদায়েত বলতে যা বোঝায় সেটার প্রসঙ্গে যা কিছু আসার তার কিছুমাত্র এতে বাদ যায় নাই। তাই, কোরআনে বিজ্ঞানের কথা থাকলেও কোরআন বিজ্ঞানের গ্রন্থ নয়। ইতিহাসের কথা থাকলেও তা ইতিহাসের গ্রন্থ নয়। দার্শনিক পদ্ধতি ও দর্শনের কথা থাকলেও এটি কোনো দার্শনিক গ্রন্থ নয়।

অসুবিধার ব্যাপার হলো, কোরআনকে এভাবে বুঝার ব্যাপারটা আমাদের সমাজে প্রচলিত নয়। দাওয়াত ও কর্মবিমুখ, ধর্মবাদিতাসুলভ অতি ভক্তির কারণে কোরআনকে বরং এক ধরনের ওভার ফোকাস করা হচ্ছে।

বলা হচ্ছে, সবকিছু কোরআনে আছে।

না, সবকিছু কোরআনে নাই। থাকার কথাও নয়। বরং, যে বিষয়টা জগৎ ও জীবন সম্পর্কে কিছু সুনির্দিষ্ট মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি, নৈতিক নির্দেশনা এবং আইনগত মূলনীতির বিষয়গুলোই শুধু কোরআনে আছে। কোরআন নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছে। কোরআনের একাধিক জায়গায়। তার একটি হলো সূরা আলে ইমরানের ১৩৮ নং আয়াত:

هٰذَا بَيَانٌ لِّلنَّاسِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةٌ لِّلْمُتَّقِينَ

“এটা (কোরআন) মানুষের জন্য (স্পষ্ট) বর্ণনা এবং মোত্তাকীদের জন্য পথ-নির্দেশ ও উপদেশ।”

এ বিষয়ে আমার এই লেখাটি পড়তে পারেন: মানবসভ্যতার প্রচলিত সংজ্ঞা ও ইতিহাস পর্যালোচনা

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Ibrahim Hossain: আপনার এ ব্যাখ্যার সাথে একমত হতে পারলাম না। আমি মনে করি প্রশ্নটি মোটেই সিলি প্রশ্ন নয়। আর প্রশ্নের উত্তরে আপনি যে যুক্তি দিয়েছেন তাও খুবই দুর্বল।

১. কোরআন আরবে এবং আরবী ভাষায় নাজিল হলেও তা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এবং সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ। কোরআনের প্রাইমারি অডিয়েন্স আরবরা হলেও তা যে শুধু আরবদেরই বোধগম্য হবে এমন কথা নেই। কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ববাসী কোরআন পড়বে এবং বুঝার চেষ্টা করবে।

২. কোরআন যদি শুধু আরববাসীদের তৎকালীন স্থানিক জ্ঞানকে ভিত্তি করে নাজিল হতো তাহলে কোরআনের মহাবিশ্ব, সৌরজগৎ, মানবসৃষ্টি সম্পর্কিত আয়াতগুলো তো তৎকালীন আরব জ্ঞান-বিজ্ঞান ধারণার অনেক বাইরে বা বিপরীত।

৩. কোরআনে এমন এমন ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ আছে যা আরববাসীদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আপনি পোস্টটা ভালো করে পড়েছেন সেজন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

আপনার প্রথম পয়েন্টটি আমাদের বর্তমান প্রসঙ্গের নিরিখে পয়েন্টলেস। অর্থাৎ এই পয়েন্টে আপনি যা বলেছেন সে ব্যাপারে একমত না হওয়ারও কিছু নাই, দ্বিমত করারও কিছু নেই। অর্থাৎ এ বিষয়ে আমরা একমত হলেও আমাদের আলোচনার কোনো বক্তব্য শক্তিশালী হবে না, না হলেও কোনো বক্তব্য খণ্ডন বা দুর্বল হবে না।

দ্বিতীয় পয়েন্টে আপনি যা বলেছেন তা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। কোরআনে তৎকালীন আরবদের জানা বিষয়গুলোকেই ফোকাস করা হয়েছে। আর মহাবিশ্ব, সৌরজগৎ, মানব সৃষ্টি সংক্রান্ত যেসব বিষয় কোরআনে এসেছে সেগুলো এমনভাবে এসেছে যাতে যে কোনো স্ট্যান্ডার্ডের মানুষজন নিজ নিজ জ্ঞান অনুযায়ী একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং পেতে পারে। অর্থাৎ multilayer meaningfulness বলতে যা বোঝায়।

আপনার তৃতীয় পয়েন্ট সম্পর্কে আমার বক্তব্য হচ্ছে, কোরআনে এমন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলা হয়নি যা সম্পর্কে প্রফেটকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি। যেমন কিছু ঘটনার কথা ইহুদীরা জানতো। স্থানীয় আরবরা সেগুলা সঠিক জানতো না। সেগুলো নিয়ে যখন ইহুদীরা প্রশ্ন করেছে তখন ওহীর মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল সেগুলোর জবাব দিয়েছেন।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য/প্রশ্ন লিখুন

ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।

*