নাসেখ-মানসুখ দ্বারা কি আল্লাহর সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায়?

প্রশ্নকর্তা: আসসালামু ওআলাইকুম। নাসেখ-মানসুখ আয়াত নিয়ে আমার একটা জিজ্ঞাসা ছিল। এই ব্যাপারে আমি কি আপনার সাথে কথা বলতে পারি?

আমার উত্তর: আমি তো এসব বিষয়ে মতামত দেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রাজ্ঞ ব্যক্তি নই।

প্রশ্নকর্তা: শ্রদ্ধেয় স্যার, আমি আপনার কিছু লেখালেখি পড়েছি এবং আপনার ভিডিও দেখছি। আমার ধারণা হয়েছে, আমার কোশ্চেনটা আপনাকে করা উচিত। আপনি হয়তো উত্তরটা দিতে পারবেন। সমাজে প্রচলিত হুজুররা নয়।

আমার উত্তর: আচ্ছা, তোমার প্রশ্নটা খোলাখুলিভাবে বলে ফেলো। এ ব্যাপারে আমার কী মত, সেটা আমি বলবো, ইনশাআল্লাহ।

প্রশ্নকর্তা: জি স্যার। নাসেখ-মানসুখ যে আয়াতগুলো আছে, সেখানে কিছু আয়াতের কার্যকারিতা আর নাই, এমনটা বলা হয়ে থাকে। আমার প্রশ্ন, সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্। তিনি সর্বজ্ঞ সর্বময় জ্ঞানের অধিকারী। আমাদের সংকীর্ণ জ্ঞানের তুলনায় সেটা অপরিমেয়। এখন আমার প্রশ্ন, যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে মহান আল্লাহ তায়ালা কেন কোনো আয়াতকে একটি নির্দেশ হিসেবে দিয়ে পরবর্তীকালে আবার সেটা বন্ধ করতে বলবেন? এখানে সৃষ্টিকর্তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পাচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয় কি? সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা যেমন একটি কথা বলার পর কখনো কখনো ভুল বুঝতে পারি। আবার পরবর্তীতে কথা বলে সেই ভুলটা সংশোধন করে নিয়ে থাকি। সৃষ্টিকর্তার বেলাতেও এমন ঘটছে, এমন নয় কি? (স্যার, দোষত্রুটি মার্জনীয়)।

আমার উত্তর: তোমার কথা তো ঠিকই আছে। আমি মনে করি না, কুরআনের কোনো আয়াত স্থগিত বা বাতিল হয়ে গেছে। কোনক্রমেই নয়। তবে এখানে একটা ‌‘তবে’ আছে। সেটা হলো—

কোরআনের মধ্যে যে আয়াতগুলো আছে সেগুলো এসেছে এর অনুসারীদেরকে দিয়ে একটা বাস্তব সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা গড়ে তোলার কাজে তাদেরকে গাইড করার জন্য। যার কারণে সেখানে আছে আয়াতসমূহের নাযিল ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বা ক্রমধারা। আরবীতে যেটাকে বলে ‌‘সুন্নাতে তাদাররুজ’।

যে কোনো ধরনের systematic course of action বা graduality’র ক্ষেত্রে আমরা জানি, পরবর্তী স্তর বা হুকুম পূর্ববর্তী স্তর বা হুকুমকে অতিক্রম করে যায়। এই হিসাবে মাধ্যমিক স্তরের বিষয়গুলো প্রাথমিক স্তরকে অতিক্রম করে যায়। এবং এই অর্থে, মাধ্যমিক স্তর প্রাথমিক স্তরের বিষয়গুলোকে প্রতিস্থাপিত করে। এভাবে, উচ্চ স্তরের বিষয়গুলোর মাধ্যমে মাধ্যমিক স্তরের বিষয়গুলো পরিপূর্ণতা লাভ করে। এবং এই অর্থে উচ্চতর স্তর তৎপূর্ববর্তী মাধ্যমিক স্তরের বিষয়গুলোকে রিপ্লেস বা প্রতিস্থাপিত করে।

এভাবে একটা সম্পূর্ণ কাঠামো গড়ে ওঠে।

আমাদের প্রচলিত আলেম-ওলামাদের সমস্যা হলো, তারা মনে করে, ইসলামী শরীয়ার যে গঠনকাঠামো, সেটা once for ever সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। এক অর্থে কথাটা ঠিকই আছে। অন্য অর্থে কথাটা ভুল।

একটা সম্পূর্ণ কাঠামো আল্লাহর রাসূল (সা) থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক যুগের মধ্যে সুসম্পন্ন হয়েছে বটে। কিন্তু এখন সেই স্ট্রাকচারটা তো আর বাস্তবে সেভাবে কার্যকর নাই। এমতাবস্থায়, এখন আমরা যারা এ বিষয়ে কাজ করছি বা করবো তাদের দায়িত্ব হলো, কীভাবে এই বিল্ডিংটাকে গড়ে তোলা হয়েছিলো সেই প্রক্রিয়াটির দিকে খেয়াল রেখে আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতার আলোকে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা। এটাই যুক্তি, বুদ্ধি ও বাস্তবতার দাবি।

এ হিসেবে যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে বুঝবো, কোরআন-হাদীসের কোনো হুকুম চিরস্থায়ীভাবে স্থগিত বা বাতিল হয়ে গেছে, এমনটি বলার বা ভাবার কোনো সুযোগ নাই।

এ বিষয়ে তুমি আমার এই লেখাটা যদি পড়ো, তাহলে আশা করি তোমার অনেক ভুল ধারণা কেটে যাবে: ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নে ক্রমধারার অপরিহার্যতা

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য/প্রশ্ন লিখুন

ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।

*