ভুল করার ক্ষমতা না থাকলে আমরা হয়ে যেতাম অ-মানুষ; নিছক প্রাণী কিংবা নিরেট বস্তু

নাস্তিকতার চার খলিফা নামে খ্যাত একাডেমিক পারসনদের অন্যতম হচ্ছেন দার্শনিক ডেনিয়াল ডেনেট। উনার একটা বিখ্যাত বইয়ের নাম হচ্ছে consciousness explained। তাতে উনি দেখিয়েছেন, আমাদের বস্তু-অতিরিক্ত মন নামক একটা সত্তা থাকার প্রমাণ হিসেবে আমরা যে first-person ফেনোমেনার কথা বলি, ব্যাখ্যাতীত সত্তা হিসেবে আমরা যে চেতনার কথা বলি, এটা ভুল। অর্থাৎ ভুল করে আমরা মনে করি যে আমাদের মন আছে এবং চেতনার মাধ্যমে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

উনার মতে, mind is an illusion and consciousness is a pure physical phenomena.

মন নিয়ে এই যে ভুল মনে করা, আমাদের এই যে মনোগত ভুল, এটি কি আসলেই ভুল?

ডেনেটের সাথে একমত হয়ে আমরা যদি স্বীকার করে নেই যে চেতনা সম্পর্কে আমাদের ধারণা ভুল। তাহলে বুঝা গেলো যে কখনও কখনও আমরা কোনো কোনো বিষয়ে ভুল করি। অর্থাৎ ভুল করাটা মানুষের অনস্বীকার্য এক মানবিক বৈশিষ্ট্য।

মজার ব্যাপার হলো, এই ভুল করার বিষয়টিই প্রমাণ করে, আমরা নিছক বস্তু নই। কেননা, বস্তু ভুল করে না বা করতে পারে না। সঠিক হওয়া বা ভুল হওয়া, ভালো হওয়া বা খারাপ হওয়া, সফলতা কিংবা ব্যর্থতা– এসব কিছুই হচ্ছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মূল্যবোধের বিষয়। এসব মূল্যবোধকে ধারণ করার জন্য সেই ব্যক্তি, নিছক একজন একক ব্যক্তিও হতে পারে, আবার ব্যক্তিসমষ্টিও হতে পারে।

যেখানে কোনো ব্যক্তিসত্তার উপস্থিতি নাই, অর্থাৎ যেখানে বস্তুই সবকিছু; সেখানে তো কোনো ভুল থাকার কথা নয়। আমাদের ভুল করাই প্রমাণ করে, ভুল করার জন্য আমাদের বস্তু-অতিরিক্ত ‘একটা কিছু’ আছে, যা বস্তুগত কার্যকারণ সম্পর্কের অনিবার্যতার অধীন নয়।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, মানুষ এবং মেশিনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যের প্রধানতম একটি হলো, মেশিন ভুল করতে পারে না। আর মানুষ ভুল না করে থাকতে পারে না। ভুল করার মাধ্যমে বোঝা যায়, সে আসলে নিছক যন্ত্র নয়।

আর হ্যাঁ, প্রাণীরাও ভুল করে। কিন্তু মানুষ ছাড়া অপরাপর প্রাণীরা ভুল করে তাদের সহজাত প্রবৃত্তি নিবারণ তথা প্রাকৃতিক জীবন যাপন করতে গিয়ে। প্রাণীকূলের নাই সভ্যতার সংকট।

অপরাপর প্রাণীদের মতো নৈমিত্তিক জীবন-যাপন করতে গিয়ে সহজাত প্রবৃত্তি সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে মানুষও ভুল করে। কিন্তু বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মের মতো উচ্চতর বিষয়ে মানুষ যে ভুলগুলো করে, সেই ধরনের কোনো ভুল করার ক্ষমতা প্রাণীকুলের নাই।

সেজন্য বলতে হয়, মানুষ বস্তু নয়। নিছক প্রাণীও নয়। ভিন্ন একটা কিছু, অনন্য। বলা যায়, সৃষ্টির সেরা।

Thanks God, who has favoured us with the capacity to do mistakes. Audacity is to deny the mistakes and keep standing on the mistakes.

Let’s learn from our mistakes.

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Rafan Ahmed: স্যাম হ্যারিসের মতও একই– কনশাসনেস একটা ইল্যুশন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: যেমন, আমরা অন্ধকারে দড়ি দেখে ভুল করে মনে করতে পারি যে সাপ দেখছি। আমরা যে ভুলগুলো করি, সেসব ভ্রম-প্রত্যক্ষণের কোনো না কোনো সঠিক কারণ থাকে বা থাকতে হয়।

অন্টোলজিক্যাল নেসেসিটি বা তাত্ত্বিকভাবে আমরা নিশ্চিত জানি, সঠিক বা সত্যিকারের কোনো কিছুর যদি কোথাও কোনো রকমের বাস্তব অস্তিত্বই না থাকে, তাহলে সেটাকে সঠিকভাবে বুঝতে না পারার সমস্যাটিও থাকার কথা নয়। সেটা সম্পর্কে ভুল করার সুযোগও থাকার কথা না।

পঙ্খিরাজ ঘোড়ার অবাস্তব কল্পনাটা আসে পাখি এবং ঘোড়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। আমাদের মন এই বিচ্ছিন্ন (discrete) অভিজ্ঞতাগুলোকে জোড়া লাগিয়ে আমাদের জন্য প্রতিনিয়ত জ্ঞান উৎপন্ন করে। এর অনেকখানি বস্তুগত দিক থেকে বাস্তবসম্মত এবং কিছু কিছু অবাস্তব। এটিই আমাদের স্বাভাবিক জ্ঞান প্রক্রিয়া।

বাস্তবে নাই এমন কিছুকে বাস্তব মনে করা তথা ভুল করার জন্যও তাই আমাদের একটা অকৃত্রিম ভোলা মন (fallible mind) থাকা জরুরি। কোনো কিছু কৃত্রিম হওয়ার জন্য কোথাও না কোথাও কিছু একটা অকৃত্রিম বা আসল হওয়া বা থাকা জরুরি। যে জগতে কোনো কিছুই আসল নয়, সেখানে কোনো কিছু কৃত্রিমও হতে পারে না।

নিছক বস্তু কখনো ভুল করে না বা করতে পারে না। ইলিউশনকে সত্যিকারের ইলিউশন হতে হলে নন-ইলিউসিভ তথা রিয়েল জ্ঞান উৎপন্নকারী মাইন্ড থাকা জরুরি। জ্ঞাতা হিসেবে মনের উপস্থিতি ব্যতিরেকে বাস্তব বস্তুজগতের উপস্থিতি অর্থহীন।

মন নিজেও যদি বস্তু হয়ে থাকে তাহলে মন নামক সেই ‘বস্তুটি’ কেন ‘মনে করবে’ (?) যে মন বলে কোনো কিছু নাই, বরং যা আছে সবই বস্তু? সোজা কথায়, বস্তু কেন বস্তুবাদী হবে?

মানুষের মধ্যে কিছু কিছু মানুষ বস্তুবাদী হওয়াটা বরং প্রমাণ করে, বস্তুবাদ হলো সেলফ-রিফিউটিং। কেননা, বস্তুবাদীরা বিশ্বাস করে যে বস্তুবাদই সঠিক। অর্থাৎ, বিশ্বাস বলে আসলে কোনো কিছু নাই!

বস্তুবাদীগণ কর্তৃক বস্তুবাদকে সঠিক বলে মনে করা বা একে বিশ্বাস করার মাধ্যমে তাদের ‘বিশ্বাস বলে আসলে কোনো কিছু না থাকার’ দাবিটি নিজের কাছেই নিজে পরাজিত হয়। বলাবাহুল্য, বিশ্বাস হচ্ছে বস্তু-অতিরিক্ত বিষয়। বিশ্বাসটা মনে থাকে। বস্তুতে থাকে না। যদিও সেই বিশ্বাস হতে পারে বস্তুকে নিয়ে।

Rafan Ahmed: স্যার, ঐসব মাথামোটাদের যারা পীর মানে তারা এগুলো বুঝে না। পীর সাহেবরা নিজেরাই তো বুঝে না। 😆

এনিওয়ে, আপনার আর্গুমেন্টটা আমার কাছে রিফ্রেশিং মনে হলো। এর আগে দার্শনিক হামযা জর্জিসের একটা ভিডিও দেখেছিলাম এই টপিকে: Are you an Illusion? Discussing Consciousness and the self

Abdullah Maroof: ভুলকে তো এক হিসেবে তথ্যের ঘাটতি হিসেবেই ধরা যায়….

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তথ্যের ঘাটতি হওয়ার কারণে ভুল হয়, এই কথাটা ঠিক নয়। বরং ভুল হলো তথ্যের অসঙ্গত সংযোগ।

Abdullah Maroof: এইটাকেও কি সংগত সংযোগের ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করা যায় না??

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: যা-ই ব্যাপার হোক না কেন, জ্ঞান সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যার কারণ হলো জ্ঞানের যে কর্তা বা ব্যক্তি, তার সমস্যা, সাবজেক্টিভিটির সমস্যা। তথ্যের সমস্যা নয়। objectivity itself can never be a problem for itself or others. it is the role of subjectivity which determines the rightness or wrongness of knowledge.

লেখাটির ফেসবুক লিংক

আপনার মন্তব্য/প্রশ্ন লিখুন

ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।

*