স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে খোলামেলা আলাপচারিতা

১. জগতের কেন্দ্রবিন্দু কি ব্যক্তি, না খোদা?

যেখান থেকে আমাদের আলোচনাটা শুরু করা দরকার, তোমার ধারণা মতে সেটা কী? মনে করো না যে, তুমি কতটুকু জানো, আমি সেটি যাচাই করতে চাচ্ছি। ব্যাপারটি আসলে তেমন নয়। এটি আসলে একটি খোলামেলা আলোচনা। ফিলোসফিতে সক্রেটিসও এ ধরনের ডায়েলেকটিক্যাল প্রসেসে আলোচনা করতেন।

আমাদের আলোচনার শুরুর পয়েন্ট হতে পারে ওয়ার্ল্ড, হতে পারে গড, হতে পারে তুমি কিংবা আমি ইত্যাদি। আমরা এ আলোচনাটা কোন জায়গা থেকে শুরু করবো? যেটাকে আমরা ধরে নেবো যে, ইট’স ওকে…।

আচ্ছা, তুমি কি সায়েন্সের, নাকি কমার্সের?

রুবায়েত: সায়েন্সের।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: সায়েন্সের হলে তো খুব ভালো। তাহলে আরো ভালো বুঝবা। আমরা যখন অঙ্ক করি, তখন কিছু সূত্র ধরে নেই। বা স্ট্যাটিসটিক্সে আমরা বলি, এই ভ্যারিয়েবলগুলো যদি কন্সট্যান্ট হয়, তাহলে বাকিটা এভাবে হবে…। তাই না? অর্থাৎ, আমরা একটা কিছু ধরে নেই। যেটা ধরে নেই প্রয়োজনে সেটাকে আবার পরে চ্যালেঞ্জ করতে পারি। কিন্তু ইনিশিয়ালি একটা জায়গা থেকে আমাদের শুরু করতে হয়।

তাহলে এ ধরনের আলোচনাটা আমরা অন্যান্য মানুষদের অস্তিত্ব থেকে শুরু করবো? নাকি, জগতের অস্তিত্ব থেকে শুরু করবো? নাকি গড থেকে? নাকি আমার একান্ত ব্যক্তিগত অস্তিত্ব থেকে শুরু করবো?

আমরা যদি ‘আমরা বনাম ঈশ্বর’ এভাবে আলোচনাটা করি, তাহলে এই আলোচনাটাতে এক ধরনের রিলেশনকে ধরে নিয়ে আগাতে হবে। সেক্ষেত্রে এই রিলেশনের একটা স্টার্টিং পয়েন্ট নিশ্চয় থাকবে। তোমার ধারণায় এখানে মূল জিনিসটা কী? আমি বা আমরা? নাকি, গড বা ঈশ্বর?

রুবায়েত: … গড, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: Is God the central point? or We?

রুবায়েত: গডই তো সেন্টার…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: God is the centre, according to religion. কিন্তু আমরা যখন যুক্তিবুদ্ধিনির্ভর একটা আলোচনা করবো, তখন গডকে ফর গ্রান্টেড কেন ধরে নিবো? God could be the object of our knowledge or subject-matter of our discussion.

রুবায়েত: We…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ঠিক তাই। আমিও সেটা মনে করি। আচ্ছা আমরা যখন We নিয়ে আলোচনা করবো, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে ‘উই’ হলো অনেকগুলো ‘আই’এর সমষ্টি। তাই তো?

আচ্ছা, তাহলে আমরা স্টার্টিং পয়েন্ট পেয়ে গেলাম। সেটি হলো আমি বা আমরা। এখন আমি জানতে চাচ্ছি, আমি যদি বলি, ‘আমি জানি না’ সেখানেও কিন্তু আমি-ই হলাম কেন্দ্রীয় চরিত্র। এটি অনস্বীকার্য। কোনো বিষয়ে আমি বলতে পারি, আমি জানি না। কিন্তু আমি তো অন্তত: এটুকু জানি যে, আমি আছি। আমার নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে‌ই যদি আমার সন্দেহ হয়, তাহলে আমি কীভাবে বলতে পারি যে, আমি জানি না, বা আমার সন্দেহ হচ্ছে? I doubt? দেকার্ত নামে একজন ফিলোসফার আছেন। তাঁকে আধুনিক দর্শনের জনক বলা হয়।

রুবায়েত: দেকার্তের নাম শুনেছি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: দেকার্তের বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে I think, therefore I am। এখানে চিন্তা বলতে তিনি আসলে doubt বা সন্দেহকে বুঝাচ্ছেন। তিনি সবকিছুকে সন্দেহ করছেন। কাউকেই বিশ্বাস হচ্ছে না। কোনো কিছুই বিশ্বাস হচ্ছে না। ধর্ম, বিজ্ঞান, সমাজ, সংস্কৃতি, এমনকি নিজের সম্পর্কেও তাঁর সন্দেহ ছিলো। সবকিছুকে সন্দেহ করতে করতে এক পর্যায়ে তিনি চিন্তা করলেন– আচ্ছা, আমিই যদি না থাকি, তাহলে এই সন্দেহটা করছে কে? সবকিছুকে যে সন্দেহ করা হচ্ছে এই ব্যাপারটিকে তো আর সন্দেহ করা যাচ্ছে না। তাহলে এই নিশ্চিত সন্দেহ ক্রিয়ার কর্তা হিসাবে আমি অবশ্যই আছি। আমি যদি নাই থাকি, তাহলে আমি সন্দেহটা কে করছে, কীভাবে করছে? সন্দেহটা কোত্থেকে আসছে?

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি দেকার্তেরও স্টার্টিং পয়েন্ট ছিলো ‘আমি’। তোমার স্টার্টিং পয়েন্ট হচ্ছে ‘তুমি’। তোমার জগতের মধ্যে তুমিই হচ্ছো সেন্টার। তাই না?

রুবায়েত:

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আচ্ছা, তোমার মা-বাবার কথাই ধরা যাক। তাঁরা তোমার যত প্রিয়ই হোক না কেন, তারা হচ্ছে তোমার জগতের সবচেয়ে কাছাকাছি বৃত্তের সদস্য। they are within the first circle of your world। কিন্তু তোমার জগতের কেন্দ্র কিন্তু তুমি-ই। একইভাবে তোমার মায়ের অস্তিত্বের ইমিডিয়েট আফটার ফার্স্ট সার্কেলের মধ্যে তুমি আছো, তোমার অন্যান্য ভাইবোনরা আছে, তোমার বাবা…

রুবায়েত: মানে, আমার মায়ের সার্কেলে আমরা আছি, বাট…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, রাইট। তোমার মায়ের সার্কেলে তোমার বাবা হচ্ছে সেকেন্ড লেভেলে। আমি একবার আমার ছোট মেয়ের সাথে একটা আলোচনা করেছিলাম। ইউটিউবে সেটা আছে। আলোচনাটির নাম দিয়েছিলাম cognitive centrality। কগনিটিভ মানে জ্ঞানগত। সেখানে আমি এ ধরনের আলোচনা করেছিলাম। সায়েন্সের ছাত্র হওয়ায় তোমার সাথে আলোচনায় আমার বেশ সুবিধা হবে। আমিও এক সময় সায়েন্সের ছাত্র ছিলাম।

এখন তুমি বলো, আমরা যে ওয়ার্ল্ড তথা বিশ্বজগতকে জানি, এর কোনো ফিজিক্যাল সেন্টার আছে কিনা?

রুবায়েত: না…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: নাই। তাহলে ফিজিক্যালি, সায়েন্টিফিক্যালি দেয়ার ইজ নো সেন্টার অব দ্যা ওয়ার্ল্ড। বাট কগনিটিভলি?

রুবায়েত: ইনফিনিট, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: অফকোর্স। এটা ইনফিনিট। তাহলে জগত ইনফিনিট; ফিজিক্যালি না হলেও কগনিটিভলি অর্থাৎ, জ্ঞানের দিক থেকে, চেতনার দিক থেকে, অস্তিত্বের দিক থেকে। চেতনার দিক থেকে কিন্তু প্রত্যেক মানুষই হলো জগতের এক একটা স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কেন্দ্র। তার নিজস্ব জ্ঞানগত জগতের।

রুবায়েত: যেমন– আমার দিক থেকে আমিই ইউনিভার্সের সেন্টার-পয়েন্ট।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এবং আমরা প্রত্যেকেই কিন্তু এজেন্ট। মানে আমাদের একটা এজেন্সি আছে, অর্থাৎ আমাদের একটা অটোনমি আছে। এই অটোনমি অনুসারে আমরা প্রত্যেক human beingই একটা সেন্টার।

তাহলে, কগনিটিভলি হাউ ম্যানি সেন্টারস আর দেয়ার ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড? ওয়ান সেন্টার, অর ফিনিট নাম্বার অব সেন্টারস, অর, ইনফিনিট নাম্বার অব সেন্টারস?

রুবায়েত: ইনফিনিট…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: রাইট। লেখাপড়ায় ভালো ছেলেদের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। ঠাস করে তারা বুঝে যায়। তাহলে, ফিজিক্যালি ওয়ার্ল্ড হ্যাজ নো সেন্টার। ওয়ার্ল্ড ইজ ইনফিনিট। বাট কগনিটিভলি ওয়ার্ল্ড হ্যাজ সেন্টারস। অ্যান্ড নাম্বার অব সেন্টারস ইজ ইনফিনিট। বিকজ, অল হিউম্যান বিইংস, অ্যাকচুয়ালি অল কগনিটিভ এজেন্টস আর ইনডিভিজুয়েল সেন্টারস অব দ্যা ওয়ার্লড।

তাহলে আমি কেন আছি, এটা হলো একটা প্রশ্ন। আমার সাথে জগতের সম্পর্ক কী, এটা ভিন্ন একটা প্রশ্ন। জগতের অতিবর্তী হিসেবে অর্থাৎ জগতের বাইরে ‘Is there any entity like God?’ সেটি একটি স্বতন্ত্র প্রশ্ন। এই সমগ্র আলাপের সেন্টার-পয়েন্ট বা সাবজেক্ট অব নলেজ হচ্ছি ‘আমি’ বা আমার সত্তা।

এখন আমি যদি বলি, ‘আমার এ জগতে আসাটা ঠিক হয় নাই’, এটি কি ঠিক? কেননা, আমরা জানি, নিজের কোনো মত বা কর্মের বিরুদ্ধে কেউ বলতে পারে। কিন্তু কাউকে নিজের অস্তিত্ব ও সত্তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করাটা অনুচিত। Nobody should be forced to witness against himself/herself। প্রত্যেকের অধিকার হলো নিজেকে ডিফেন্ড করা। নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়া কিন্তু ন্যাচারাল ল বা আমাদের জুডিশিয়াল সিস্টেমে অনুমোদন করা হয় না।

তাহলে ‘আমি’ দিয়ে জগতের আলোচনার শুরু। আমি যে আছি এটা নিশ্চিত; গড আছে কি না, সেটা নিশ্চিত না। চাঁদের অপর পিঠে পাহাড় আছে কিনা, তা নিশ্চিত না। আমি যতই ইনসিগনিফিকেন্ট হই না কেন, আমি যে আছি সেটা নিশ্চিত। আমার কোনো কাজ খারাপ হতে পারে। আমি ভুল করতে পারি। অপরাধ করতে পারি। কিন্তু আমার অস্তিত্বটাই স্বয়ং খারাপ হতে পারে না। তাই না?

২. যুক্তি আর বিশ্বাস কি পরস্পর বিপরীত?

তাহলে আমরা দেখবো, আমার সাথে স্রষ্টার সম্পর্কটা আসলে কী? এবং এই সম্পর্ক অনুসারে গড আমার কাছে র‍্যাশনালি অ্যাপিয়ার করে কি না? ট্র্যাডিশনাল ইসলামপন্থীদের কথা হলো, বিলিফ বা বিলিফ সংশ্লিষ্ট যে কোনো ব্যাপার হলো র‍্যাশনালিটির বাইরের বিষয়। তাদের মতে, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে যুক্তি কাজ করবে না। এ ব্যাপারে তারা বিলিফ বনাম র‍্যাশনালিটি, এ ধরনের একটা বাইনারি নিয়ে আসে। তাদের কথা হলো, তুমি বিলিফকে গ্রহণ করবে, নয়তো র‍্যাশনালিটিকে গ্রহণ করবে। র‍্যাশনালিটি গ্রহণ করলে তুমি স্কেপটিক, এগনস্টিক, এথিস্ট হবা; আর যদি বিলিফ গ্রহণ করো, তাহলে তো বিলিভার হবা। তারপর বেহেশতে সুখশান্তিতে থাকতে পারবা। দিস ইজ দেয়ার অ্যাপ্রোচ।

আসলে আমি এসব ভুল ধারণাগুলো নিরসন করার জন্যই কাজ করছি। আমিও মনে করি, এ দুটি জিনিস আলাদা। কিন্তু আমাদের হিউম্যান র‍্যাশনালিটির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। বিলিফ দ্বারা সাপ্লিমেন্ট করে আমরা এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠি। তাহলে একটি হলো, তুমি কিছুদূর গিয়ে আরো অগ্রসর হলে। আরেকটা হলো, তুমি সেই পথে না গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে গেলে। দুটি কিন্তু ভিন্ন জিনিস। তাহলে র‍্যাশনালিটি বাদ দিয়ে বিলিফ এক জিনিস। আরেকটা হলো র‍্যাশনালিটি দিয়ে আমার যদ্দুর কুলায়, তদ্দুর পর্যন্ত র‍্যাশনালিটি চর্চা করার পর যখন যুক্তি আর কভার করতে পারছে না, সেখানে আমি একটা বিলিফের আশ্রয় নিলাম।

রুবায়েত: হ্যাঁ…।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এখন বিলিফকে এভাবে নেয়াটা জাস্টিফাইড কিনা, সেই আলোচনাতে আমাদের আসতে হবে। আচ্ছা, তোমাকে একটা উদাহরণ বলি, যেহেতু তুমি অনেক ইন্টেলিজেন্ট, তুমি বুঝবা। সেটি হলো, যখন আম্পায়ার খেলা শুরু করে; ক্রিকেটের ক্ষেত্রে তখন এক পক্ষকে ব্যাটিং করতে হয়, আরেক পক্ষকে ফিল্ডিং করতে হয়। কিংবা, ফুটবল খেলায় কাউকে না কাউকে ফুটবলে কিক করেই কিন্তু খেলাটা শুরু করতে হয়। তাহলে প্রথমে কে কিক করবে? আমরা যদি বলি, ঠিক আছে, রেফারিই কিক করবে। তাহলে প্রশ্ন আসে, রেফারি কোন দিকে কিক করবে?

রুবায়েত: যে কোনো দিকেই কিক করতে পারে।

সেক্ষেত্রে রেফারির কিকটা কোনো এক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে যেতে পারে। এর সমাধান হিসেবে রেফারি না হয় বলটা মাঠের মাঝখানে একটু নাড়িয়ে দিয়ে খেলা শুরু করে দিলো। কিন্তু আরেকটা সমস্যা হলো, আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির কারণে ওই সময় হয়তো উত্তর দিকের গোল পোস্ট কিছুটা সুবিধাজনক। এখন উত্তর দিকে কোন পক্ষ থাকবে? এ ধরনের প্রতিসম বা কাউন্টার-ব্যালান্সড সিচুয়েশনে লটারী বা টস করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এটি আমরা জানি।

রুবায়েত: হুম।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এখন তুমি বলো, টস করা কি ভালো?

রুবায়েত: স্যার, টস করার ব্যাপারে তো উভয় পক্ষেরই সম্মতি আছে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মনে করো, তারা সম্মত হলো না। তাহলে বিকল্প কী হতে পারে?

রুবায়েত: তাহলে তো কোনো ডিসিশনেই আসা যাবে না।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, ঠিক তাই। এ ধরনের প্রতিসম ন্যায্যতার ক্ষেত্রে আমরা টস বা লটারি করি। এর মাধ্যমে কিন্তু আমরা আমাদের প্রচলিত জাস্টিফিকেশন প্রসেস থেকে বেরিয়ে আসলাম। কিন্তু ওই বিশেষ পরিস্থিতিতে লটারি ছাড়া জাস্টিফিকেশনের অন্য কোনো অল্টারনেটিভ আমাদের হাতে নাই। তাহলে দেখা যাচ্ছে, সবকিছুকে যাচাই করতে চাওয়ার ব্যাপারে ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আরেকটা যুক্তি হলো Inference to the Best Explanation, সংক্ষেপে IBE। এটাকে বলে abductive logic। লোকেরা ইনডাক্টিভ-ডিডাক্টিভের কথা জানলেও অ্যাবডাক্টিভ লজিকটা ততটা প্রচলিত নয়। Inference to the Best Explanation হচ্ছে– ধরো, খেলার মধ্যে একজন রেফারি বা আম্পায়ার আছেন। তিনি টস করে উভয়পক্ষকে একটা পথ বাতলে দিলেন। এটি আইবিই প্রিন্সিপ্যালকে কম্প্লাই করে। মনে করো এক জায়গায় যেতে যেতে হঠাৎ দেখলা, তোমার ডানে, বায়ে ও সামনের দিকে একটা করে রাস্তা আছে। কিন্তু কোনো রাস্তাকেই তুমি প্রায়োরাটাইজ করতে পারছো না। এখন তুমি কোন দিকে যাবা?

রুবায়েত: এটা আমার চয়েসের ব্যাপার। এখানে তো বিষয়টা আমার উপরেই নির্ভর করছে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ঠিক আছে, কিন্তু সেই চয়েসটা তুমি কীভাবে ঠিক করবা?

রুবায়েত: গেস করবো।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: রাইট। তাহলে আমরা যদি বলি, X, Y, Z তিনটি রোড। এরমধ্যে তুমি Z-কে গেস করেছো। এই গেস করাটা কি তোমার জন্য জাস্টিফাইড হয়েছে?

রুবায়েত: জী স্যার?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: পথের সঠিক অপশনটার ব্যাপারে তুমি শিওর হতে পারছো না, সবই তোমার কাছে সমান মনে হচ্ছে; এমতাবস্থায় তোমার মনের টান যেদিকে গেলো, সেদিকেই তুমি গেলা। এটা কি তোমার জন্য লজিক্যাল, র‍্যাশনাল, জাস্টিফাইড হলো?

রুবায়েত: না, স্যার। এটা তো জাস্ট অনুমাননির্ভর…।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আচ্ছা, তুমি যদি বলো এটি জাস্টিফাইড হয়নি, তাহলে সঠিক সমাধান বা করণীয় কী হতে পারে?

রুবায়েত: মানে কীভাবে আমি এটার জাস্টিফিকেশন করবো?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হুম।

রুবায়েত: তাহলে তো পথের শেষ পর্যন্ত গিয়েই সেটি করতে হবে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ধরো, একটি পথের শেষ পর্যন্ত গিয়ে ফেরত আসলা। সে ক্ষেত্রে বলতে হবে, তুমি যথেষ্ট ভাগ্যবান। আবার আরেকটা পথ ধরে গেলা, তারপর ফেরত আসলা। এভাবে, X এবং Y পথকে পরীক্ষা করে দেখা হয়ে যাবার পর, সহজেই তুমি বুঝতে পারবা, Z পথটিই হচ্ছে সঠিক পথ। কিন্তু, যদি এমন হয়, এক দিকে যাওয়ার পর, সে পথ সঠিক হোক বা ভুল হোক, তুমি আর ব্যাক করতে পারবা না।

রুবায়েত: এ রকম পরিস্থিতিতে তো যেখানে আছি, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মনে করো, তুমি দাঁড়িয়েও থাকতে পারছো না। তোমাকে অবশ্য কোনো না কোনো পথে যেতে হবে। লক্ষ্যে তোমাকে পৌঁছতেই হবে। তখন তুমি কী করবা?

রুবায়েত:

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমি বলতে চাচ্ছি, কিছু কিছু পরিস্থিতিতে ক্লিয়ার-কাট কোনো অপশন পাওয়া যায় না। বরং এভেইলেবল অপশনগুলো হয় counter-balanced। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা ইনফারেন্স করি, মানে অনুমান বা গেস করি (এগুলো সমার্থক। এগুলোর আরো সমার্থক হলো প্রায়োরাটাইজ করা, বিলিভ করা, বেটার মনে করা)। এতে করে আমরা কোনো একটা পথকে আমাদের কাছে বেটার মনে হয়। মনে হয়, এটিই যেন যুক্তি-বুদ্ধির দাবী কিংবা একমাত্র যৌক্তিক পন্থা। বাস্তব জগতে যেহেতু সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকা যাচ্ছে না। জীবন ও জগতের ব্যাপারে নিরপেক্ষতা হলো দায়িত্বজ্ঞানহীন নির্লিপ্ততার পরিচায়ক। কোনো না কোনো পথে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হয়। কারণ, তুমি দাঁড়িয়ে থাকলে নিশ্চিত মারা পড়বা। এগিয়ে গেলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। যে কোনো পথে যদি তুমি এগিয়ে যাও, তাহলে স্ট্যাটিসটিক্যালি শতকরা ৩৩.৩৩ ভাগ সম্ভাবনা আছে যে তুমি সঠিক পথে যাচ্ছো।

৩. বিজ্ঞান দিয়ে কি স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ বা খণ্ডন করা যায়?

আমাদের যে হিউম্যান র‍্যাশনালিটি রয়েছে, যা দিয়ে আমরা ‘গড কেন আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন’ তা যাচাই করি; সেই র‍্যাশনালিটির স্বরূপটার ব্যাপারে আমরা আগে সুরাহা করে নেয়া দরকার। তারপর আমরা ওই আলোচনার মধ্যে আসবো। তাহলে জগতের বাইরে গড আছে কিনা, আমাদের হিউম্যান ক্যাপাসিটি দিয়ে এই প্রশ্নের সমাধান কীভাবে সম্ভব? কারণ, সায়েন্টিফিক্যালি কেউ ক্লেইম করবে না, এখন বা কোনো ভবিষ্যতে মানুষের পক্ষে কখনো জগতের শেষ সীমানা বা কিনারায় গিয়ে দেখা, এর বাইরে কিছু আছে কিনা। গ্রহ-নক্ষত্র আছে কিনা যাচাই করে দেখার মতো করে গড আছে কিনা তা যাচাই করে দেখা তাত্ত্বিকভাবেই অসম্ভব। বলাবাহুল্য, যা তাত্ত্বিকভাবেই অসম্ভব তা বাস্তবে যাচাই করে দেখার দরকার পড়ে না। তাই গড আছে কিনা তা এক্সপেরিমেন্টালি প্রুভ বা ডিসপ্রুভ করার দাবি কেউ করবেও না।

কিন্তু কেন জানি মানুষ এটি ভেবে গলদঘর্ম হয়েছে বা হয়, জগতের অতিবর্তী কিছু আছে কিনা। ‘একটা কিছু’ কি আছে? কারো উত্তর হ্যাঁ, কারো উত্তর না। যদিও আরো অনেকগুলো পক্ষ আছে, কিন্তু আমরা মোটাদাগে যদি বলি, যারা ‘হ্যাঁ’ বলছে তারা আস্তিক; আর যারা ‘না’ বলছে তারা নাস্তিক। তাহলে তুমি এমন একটা বিষয়ে এনগেইজ হচ্ছো, যে ব্যাপারে তোমার ফিজিক্যাল ক্যাপাসিটি দিয়ে সমাধান বা উত্তর পাওয়ার উপায় নাই।

যারা ‘না’ বলছে, তারাও কখনো গিয়ে দেখেনি যে, নাই। তারা তাদের জীবনে যত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, সেগুলো কাজে লাগিয়ে, র‍্যাশনালি চিন্তা করে, যুক্তি দিয়ে তারা ভেবেছে যে, মনে হচ্ছে যেন গড নাই, থাকার কথা নয়। আর যারা ‘আছে’ মনে করছে তারা বলছে, এই এই যুক্তির কারণে আমার কাছে মনে হচ্ছে গড আছে। তাহলে আমাদের ফিজিক্যাল ক্যাপাসিটি বা সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে এ ধরনের একান্ত মানবিক ও মৌলিক বিষয়ে কোনো কনক্রীট প্রমাণ হাজির করা সম্ভব নয়। এমতাবস্থায়, আমাদের যুক্তি ও অনুমান দিয়ে যদ্দুর পারি, আমরা এটার একটা সমাধান বের করার চেষ্টা করবো।

তাহলে বুঝা গেল, হিউম্যান র‍্যাশনালিটি কিন্তু একটা লিমিটেড এন্টারপ্রাইজ।

রুবায়েত: হ্যাঁ, হ্যাঁ, লিমিটেশন…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কিন্তু আমি তোমার সাথে এ বিষয়ে এগ্রি করি, আমার ক্যাপাসিটি যত লিমিটেডই হোক না কেন, যা-ই আমি গ্রহণ করি না কেন, সেটাকে হতে হবে আমার যুক্তি-বুদ্ধির অনুকূল। কী বলো?

রুবায়েত: হুম।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তাহলে আমরা আগাগোড়াই যুক্তিবাদী থাকবো। এতক্ষণের আলোচনায় আমাদের এক নম্বর ফাইন্ডিংস হচ্ছে, আমরা ‘I’ অথবা ‘me’ দিয়ে শুরু করছি। দুই নম্বর হলো, আমাদের ক্যাপাসিটি লিমিটেড, কিন্তু প্রশ্ন, কৌতুহল ও জ্ঞানপিপাসা আনলিমিডেট।

৪. গড বলতে আমরা আসলে কী বুঝি বা বোঝাই?

এখন আসো গড আছে কিনা, সেই প্রশ্নে আমরা যাই। যদিও তুমি সে প্রশ্নটি করো নাই। যা হোক, চল আমরা গডকে ডিফাইন করি। গড বলতে আমরা আসলে কী বুঝাচ্ছি? গডের কী কী বৈশিষ্ট্য হতে পারে? গড আছে কি নাই, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। যদি গড থেকে থাকে, তাহলে এই ‘গড’ নামক এনটিটির কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি? বলো।

রুবায়েত: কোনো ধর্মের বিচারে আমরা যাবো না। যদি গড থাকে তাহলে তার কেমন হওয়া উচিত, সেটি আমরা দেখবো।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: না, সে আলোচনায় আমরা পরে যাবো। এখানে একটা ভুল হচ্ছে। আমরা বলতে চাচ্ছি, যারা গডের কথা বলছে… মনে করো, তুমি আর আমি আস্তিক বা নাস্তিক কোনো পক্ষ নই। আপাতত আমরা নিরপেক্ষ। এখন যারা গডের কথা বলছেন, তারা গডের কী বৈশিষ্ট্য দাবি করছেন বলে এই নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে আমরা দেখতে পাই?

রুবায়েত: ইনফিনিট হতে হবে…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: গডকে ইনফিনিট হতে হবে। ওকে। তারপর?

রুবায়েত: ইনফিনিট বললেই তো সব এসে পড়ে। মানে, সবদিক থেকেই গডকে অসীম হতে হবে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কথার কথা, গডকে হতে হবে সর্ব শক্তিমান, পরম মানের নিখুঁত, সর্ব মঙ্গলময় ইত্যাদি। এগুলো আসলে সব সমার্থক। তারপর, আমরা যদি বলি, তিনি আছেন জগতের অতিবর্তী বা beyond the world। কারণ, জগতের বাইরে না হলে তিনি জগত সৃষ্টি করবেন কীভাবে? এ ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলো ছাড়া আর কিছু বলবা তুমি?

রুবায়েত: আসলে সবগুলো তো এগুলোর ভেতরেই পড়ে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: রাইট। তাহলে আমরা যখন ‘আমি বনাম গড’ আলোচনা করছি, তখন আমার বৈশিষ্ট্য কী পাওয়া গেলো? আমার একটা শারীরিক অস্তিত্ব আছে। এবং এই অস্তিত্বটি নানাভাবে সীমায়িত। আমার আছে র‍্যাশনালিটি। এই র‍্যাশনালিটি আবার ক্যাপাসিটির দিক থেকে লিমিটেড, কিন্তু ডিমান্ড বা ক্লেইমের দিক থেকে আনলিমিটেড। আমার র‍্যাশনাল ডিমান্ডের বাইরে গিয়ে তো আমি কোনো কিছু করতে পারি না, করতে চাইও না। কেননা তাতে করে আমি ইর‍্যাশনাল হয়ে পড়বো। তারপর ধরো, আমার কিছু সাইকোলজি আছে। যেমন– প্রত্যেকে সুখ চায়। সবাই লাইফের একটা কন্টিনিউটি চায়। প্রত্যেকে চায় যেন সে লাইফকে এনজয় করতে পারে। এনজয় করে বলেই তো সে নানা ধরনের তত্ত্ব, মত ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের ভাল ও সুখকে বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করে। তাহলে আমার বৈশিষ্ট্য এগুলো, আর জগতের বৈশিষ্ট্য ওগুলো।

৫.  গড থেকে থাকলে আমাদের কাছে তিনি কীভাবে এপিয়ার হতে পারেন? ‘ঈশ্বর সর্বশক্তিমান’ এ কথার মানে কী?

এবার আসো, আমি একজন কগনিটিভ এজেন্ট (আমার কিছু জ্ঞান আছে, এই অর্থে) হিসেবে…

ধরো, M বনাম G এর এই মামলায় M হলো Man, আর G হলো God। এখানে আমরা M ও G-এর যেসব বৈশিষ্ট্য পেলাম সে অনুযায়ী, G-কে সম্পূর্ণভাবে জানা M-এর পক্ষে সম্ভব কি না? লজিক্যালি?

রুবায়েত: লজিক্যালি সম্ভব নয়।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তোমার কথার মধ্যেই ছিলো, তুমিও বলেছো যে, যতটুকু আমাদের সাথে সম্পর্কিত, ততটুকু নিয়ে আমরা প্রশ্ন করতে পারি। আমরা যদিও পুরোটা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারি না… তুমি বলেছো, তিনি জবাবদিহি করতে বাধ্য নন। আমি বলতে চাই, এমনকি তিনি জবাবদিহি করলেও সেটা তো আমি নিতে পারবো না। কেউ যদি আমাকে এগারো মাত্রার বাস্তবতায় বা ইলেভেন ডাইমেনশনে একটি উত্তর দেয়, আমি তো তিন ডাইমেনশনের বেশি ধরতেই পারবো না। তাহলে গড আমাদের জগতকে কেন সৃষ্টি করেছেন…

রুবায়েত: একটা প্রশ্ন আছে। গড তো সব পারেন। তাহলে ইলেভেন ডাইমেনশন দিয়ে তো তিনি আমাদেরকে…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হুম, গড সব পারেন। তাহলে তিনি অল ডাইমেনশন দিয়ে আমাদের বুঝাতে পারছেন না কেন?

রুবায়েত: স্যার, এই… আমরা তো এটা বলতে পারি না যে, তিনি চাচ্ছেন না। আমরা তো এটা বলতে পারি না। আমরা বলতে পারি যে, হয়তো আমরা…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমরা কিন্তু নির্ভর করবো লিমিটেড হওয়া সত্ত্বেও আমাদের যে র‍্যাশনালিটি রয়েছে, তার উপর। ঠিক আছে তো?

রুবায়েত: হুম।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আচ্ছা। মনে করো, God with all His power, তিনি যদি তাঁর পরিপূর্ণ সত্ত্বা হিসেবে টোটালি আমাদের সামনে অ্যাপিয়ার করেন এবং আমাদের যদি সেটি বুঝার মতো ক্যাপাসিটি হতে হয়, তাহলে আমাদেরও তো একেক জন ইন্ডিপেন্ডেন্ট গড হতে হবে।

কিন্তু গডের ধারণাটাই এমন যে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট গড কিন্তু একাধিক হতে পারে না। গডের মধ্যে সাব-অর্ডিনেট এবং সুপিরিয়র-ইনফেরিয়র হতে পারে। যারা বহু ঈশ্বর, অবতার ইত্যাদির কথা বলে, তারা কিন্তু গডদের মধ্যে একটা হায়ারআর্কি সেট করে। কিন্তু সুপ্রিম গড একাধিক হতে পারে না, বাই ইটস ওউন ডেফিনেশন। এখন, উইথ অল হিজ ক্যাপাসিটি আমাদেরকে তিনি যদি বুঝান এবং আমরা যদি সেটা বুঝতে পারার মতো হতে হয় তাহলে তো পুরো ধারণাটাই তত্ত্বগতভাবে (ontologically, সোজা কথায়, লজিকেলি) স্ববিরোধী ও অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এটাকে বলে omnipotent paradox। এতে বলা হয়, গড কি এমন কোনো পাথর তৈরী করতে পারেন, যা তিনি উত্তোলন করতে পারেন না? এই প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ বললেও গডের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, না বললেও পড়বে। তিনি এমন পাথর যদি তৈরি করতে না পারেন, যেটা এতোটাই বড় …; তাহলে তিনি তো সর্বশক্তিমান নন। আর তিনি যদি নিজের সৃষ্টি করা একটা পাথর তুলতে না পারেন, তাহলেও তিনি সর্বশক্তিমান নন, এটাই প্রমাণিত হয়। এটাকে বলে অমনিপটেন্ট প্যারাডক্স। এর নানা ধরনের ফরম হতে পারে।

কিন্তু এগুলো ভুল যুক্তি। কারণ, আমরা যখন গডকে অল পাওয়ারফুল বলি, তখন কিন্তু আমাদের লজিক্যাল সেন্সেই সেটি বলি। প্র্যাকটিকেলি না পারলেও লজিক্যালি আমরা যা কিছু সম্ভব বলে মনে করি, সেটা তিনি করার ক্ষমতা রাখেন; সেই অর্থে তাঁকে আমরা সর্ব শক্তিমান বলি।

আমি এখানে খাতায় একটি স্কয়ার আঁকলাম।

রুবায়েত: আপনার কথাগুলো আমার কাছে রাসেলের কথার মতো লাগছে…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: অমনিপটেন্ট প্যারাডক্স?

রুবায়েত: হ্যাঁ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এটা ওরাই বলেছে। আচ্ছা, শোনো। এই প্যারাডক্সের সমস্যাটা বলি। তুমি যখন ল্যাঙ্গুয়েজে একটা শব্দ বলো, সেটার কিন্তু একটা সুনির্দিষ্ট অর্থ বা কনোটেশন আছে। আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এর একটা সিমানটিক্স আছে। এর একটা মিনিং আছে। মনে করো, H2O দিয়ে যা বুঝায়, ওয়াটার শব্দটি দিয়েও তাই বুঝায়। কিন্তু H2O যখন লেখা হবে, সেটি কিন্তু কেমেস্ট্রির কোনো বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যখন ওয়াটার বলা হবে, তখন এটি আমাদের সোশ্যাল বা পার্সোনাল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। যদিও দুটি দিয়ে একই বিষয়কে বুঝায়।

সে জন্য আমরা যখন পাওয়ারফুল শব্দটি বলি, তখন আমরা আসলে কী বুঝাই? আমি তোমাকে একটা উদাহরণ বলি। মনে করো, আমি একটি স্কয়ার বা বর্গক্ষেত্র আঁকলাম এখানে। বর্গক্ষেত্রের ভেতর আমি একটা বৃত্ত আঁকলাম। বর্গক্ষেত্রের বাইরে চারটি কোণকে স্পর্শ করে, এমন একটি বৃত্তও আমি আঁকলাম। আবার এই বৃত্তের বাইরেও আমি আরেকটা বর্গক্ষেত্র আঁকতে পারি, যেটা এই বর্গক্ষেত্রের চারটি বাহুর মাঝখানে স্পর্শ করবে। এভাবে করে আমি সারাজীবন যা কিছু করি না কেন, আমি কখনোই ক্লেইম করতে পারি না, সম্ভাব্য কোনো জগতে কেউ একজন এতটাই পাওয়ারফুল হতে পারে যে তিনি এমন একটা বর্গক্ষেত্র আঁকতে পারে যা একইসাথে একটা বৃত্তও বটে। মানে, কোনো পসিবল ওয়ার্ল্ডেও কিন্তু বর্গাকার বৃত্ত হবে না। হবে কি?

এখন আমরা যদি বলি, গড হলো এতটাই শক্তিমান যে তিনি একটা বর্গাকার বৃত্ত আঁকতে পারেন। আমরা কিন্তু এটা বলতে পারি না। তারমানে, আমরা যখন গডকে অল পাওয়ারফুল বলি তখন আমরা একটা লজিক্যাল সেন্সেই কথাটা বলি। দ্বিরুক্তি করে বললে, যেগুলো আমরা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভাব্য বলে মনে করি, কিন্তু আমাদের বা কারোর যেগুলো করার ক্ষমতা নাই, গডের তা আছে। তাহলে গড চাইলে আমাদেরকে বুঝাতে পারেন, কিন্তু গড যদি আমাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পুরো জিনিসটা বুঝাতে হয়, তাহলে গডকে যা করতে হবে, তা হলো আমাদেরকেও এক একটা সমকক্ষ গড হিসাবে গড়ে তোলা। গডকে পরিপূর্ণভাবে জানতে ও বুঝতে হলে গডের ক্ষমতা এবং আমাদের ক্ষমতা সমান সমান হতে হবে। অথচ, দু’টি বা একাধিক অসীমের ধারণার মতো এটি কন্ট্রাডিকটরি ও সেলফ-রিফিউটিং নোশন।

তারমানে এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝলাম, গড ও মানুষ হলো আলাদা ক্যাটাগরি। গডের অস্তিত্ব আছে কি না, সেটা পরের প্রশ্ন। গড হাইপোথিসিস অনুসারে, গডের সাথে যখন মানুষের একটা রিলেশন আমরা চিন্তা করবো, তখন M সমান সমান G, এভাবে আমরা ভাবতে পারবো না। কেননা, গডের সাথে মানুষের সম্পর্ক আইডেন্টিক্যাল, ইকোয়াল বা সেইম-টু-সেইম নয়। বরং গড হলেন সুপিরিয়র, আর মানুষ তাঁর সাব-অর্ডিনেট। যদি আমরা গডের সবকিছুকে বুঝতে চাই, তাহলে আমাদেরকেও গড ফ্যামিলির মেম্বার হতে হবে। কিন্তু এটা যে সম্ভব নয়, একটু আগে আমরা সেটি আলোচনা করেছি।

৬. গড হাইপোথিসিসকে গ্রহণ কিংবা বাতিল করার কাজে অধিবিদ্যা ও জ্ঞানতত্ত্ব কী ভূমিকা পালন করে?

খোদা আমাদেরকে কেন সৃষ্টি করলেন? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আলোচনাটা আমাদের ‘সেলফ’ থেকে আমরা শুরু করা যাক। আমাদের রিজন দিয়েই আমরা সবকিছু বিবেচনা করবো এবং সেটা থেকে আমরা একটা যৌক্তিক উপসংহারে আসার চেষ্টা করবো।

আসলে গডের প্রসঙ্গটি কেন আসছে? একটি মৌলিক প্রশ্ন। আমাদের অস্তিত্বগত আরো যেসব মৌলিক প্রশ্নকে আমাদের মোকাবেলা করতে হয় সেগুলো একটা আরেকটার সাথে কানেকটেড। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, আমি কে? আমি কোত্থেকে এসেছি? কী আমার পরিচয়? এ জগত কেন এভাবে? জগতের সাথে আমার শুদ্ধ সম্পর্ক কী হওয়া উচিত? নৈতিকতার ভিত্তি কী? এসব কিছুর পিছনে কোনো সচেতন সত্তা বা কোনো উদ্দেশ্য কী আছে? কীভাবে আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে পারি। কিংবা, বলা যায়, এসব প্রশ্ন আমাদের বিচলিত করে কেন? কেন আমরা অন্যান্যদের চেয়ে আলাদা?

আমরা যদি বলি, আমার জন্ম কেন হলো? আমি কোথায় আছি? এর উত্তর হতে পারে, আমি জগতের মধ্যে আছি। তাহলে প্রশ্ন জাগে, জগত কী? জগতের সাথে আমার সম্পর্ক কী? এই ধরনের বেসিক একজিস্টেনশিয়াল কোয়েশ্চেন নিয়ে আমরা যখন ভাবি, তখন এসবকিছুর মূল কারণ হিসেবে গড টাইপের কোনো হায়ার এনটিটিকে আমরা স্বীকার করবো কি না, সেই প্রশ্নটা তখন প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে, বুঝা গেল, গড থাকুন বা না থাকুন, গড নিয়ে আমাদের চিন্তা বা অনুসিদ্ধান্ত হলো আমাদের এক ধরনের ডিপ থট বা র‍্যাশনাল চিন্তার আউটকাম।

হ্যাঁ, তুমি নেগেটিভ সেন্সেও বলতে পারো…। তুমি যেহেতু সায়েন্সের স্টুডেন্ট তাই তোমার সাথে কথা বলতে আমার সুবিধা হবে। আমরা যখন বলি, মাইনাস ১০। এটি তো আসলে ম্যাথমেটিক্সে একজিস্ট করে। ফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ডে তো এটি একজিস্ট করে না। আমরা যখন বলি, মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস টেম্পারেচার। এটি আসলে সেলসিয়াসের দৃষ্টিতে মাইনাস ১০। কিন্তু আমরা যদি একই তাপমাত্র ফারেনহাইটে হিসাব করি, তখন কিন্তু সেটি আর মাইনাসে যাবে না। এবসিলিউট জিরোর তুলনায় এটি সামথিং তো বটে।

সেজন্য আমরা যখন গডকে আমাদের র‍্যাশনাল আউটকাম বলবো তখন এথিস্ট কেউ বলবে, আমি তো এখনো গডে পৌঁছি নাই, আপনি একে র‍্যাশনাল আউটকাম বলছেন কেন?

আসলে আমাদের রিজন কিন্তু কিছু বিষয়কে ধরে নেয়। না ধরলে সে আগাতে পারে না। এ ধরনের আমরা কিছু থিওরিটিক্যাল এনটিটিকে ধরে নেই। গণিতের উদাহরণ তো বললাম। এবং এভাবে কোনো কিছুকে প্রমাণের আগে প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ না করলে আমরা আমাদের পজেটিভ এনটিটিগুলো নিয়ে ডিল করতে পারি না। এই বিষয়টাকে বলা হয় অন্টলজি (ontology) তথা তত্ত্ববিদ্যা। কথাটা খুব ক্লিয়ার যে, আমরা যদি মাইনাস না ধরি, তাহলে তো প্লাস পাই না। জিরোকে নন-নেগেটিভ বলে, কিন্তু একে নন-পজেটিভ বলা হয় না কেন, সেটা অবশ্য আমি বুঝি না।

রুবায়েত: জিরোকে তো নন-নেগেটিভও বলে, আবার নন-পজেটিভও বলে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: একজাক্টলি। না, আমি শুধু… আমার এক বন্ধু আছে ম্যাথমেটিক্সের টিচার, স্কুলে শিক্ষকতা করে। বলে যে, জিরো হলো নন-নেগেটিভ। আমি বললাম, কেন? নন-পজেটিভ হলে অসুবিধা কী?

এনিওয়ে, আমাদের আগের আলোচনায় আমি যেটা বলেছিলাম, আমাদের ‘থিওরি অব নলেজে’র মধ্যে এ ধরনের এপিস্টেমিক স্কেলের কথা বলা আছে যেটার একটা ফর্ম হচ্ছে কাউন্টার-ব্যালান্সড জাস্টিফিকেশন বা সিচুয়েশন।

তাহলে গডের ধারণা আমাদের কাছে এসেছে একটি র‍্যাশনাল আউটকাম হিসেবে। তবে সেটি এথিস্টদের কাছে নেগেটিভ সেন্সে এবং থিইস্টদের কাছে পজেটিভ সেন্সে। তাহলে আমার অস্তিত্ব ও সত্তা দিয়ে শুরু, আমার সাথে জগতের সম্পর্ক হলো এর পরবর্তী ইস্যু, এবং পুরো ব্যাপারটিকে সলভ করার জন্য আমরা গড হাইপোথিসিসকে মেনে নিবো কি না, সেটি হলো ফাইনাল বিষয়।

আমরা আগেই একমত হয়েছি, আমরা এবং ঈশ্বর বা খোদা – দুটি কিন্তু ভিন্ন ক্যাটাগরি। আমাদের যে বৈশিষ্ট্যগুলো আগের আলোচনায় আমরা ঠিক করেছি যে– আমাদের অস্তিত্ব আছে। আমাদের লিমিটেড র‍্যাশনালিটি আছে। এই র‍্যাশনালিটি আমাদের ফিজিক্যাল গেটআপের দ্বারা ডিলিমিটেড। যদিও এপিসটেমিক ক্লেইম বা লজিকেল ডিমান্ডের দিক থেকে এটি আনলিমিটেড। আমাদের কিছু সাইকোলজি আছে। সুখ-দুঃখের অনুভূতি আছে। লাইফের একটা কন্টিনিউটি আছে, সেটা যেই ফরমেটেই হোক না কেন, ইত্যাদি।

অন্যদিকে গড হলেন ইনফিনিট। ইনফিনিট হওয়ার কারণে তিনি মোস্ট পারফেক্ট, অল পাওয়ারফুল, অল গুড, বিয়ন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড, মোস্ট কাইন্ড ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সবগুলো আসলে কোনো না কোনোভাবে ইনফিটিকে ধারণ করে।

তাহলে আমরা এটুকু একমত হয়েছি যে, individually and collectively human beings are limited and by the very hypothesis, GOD is unlimited। তাহলে লিমিটেড এবং আনলিমিটেডের যে সম্পর্ক, মানে পার্টিকুলার এবং ইউনিভার্সালের যে সম্পর্ক, আমরা যদি একে এভাবে বলি– পারফেক্ট এবং ইমপারফেক্টের মধ্যে যে সম্পর্ক, তা কিন্তু হায়ারআর্কিক্যাল রিলেশন হবে, হরাইজন্টাল হবে না। অর্থাৎ, মানুষ এবং স্রষ্টা কিন্তু সমানে সমান হবে না। বরং, মানুষ হবে স্রষ্টার অধীন।

এখন আপাতত কিছুক্ষণের জন্য গডের আলোচনাটি স্থগিত করে আমরা যদি বলি, entity-1 (e-1) এবং entity-2 (E-2), এর রিলেশন কী হবে তা নিয়ে কথা বলি। এখানে e-1 এর বৈশিষ্ট্য হলো– লিমিটেড, পার্টিকুলার ও ইমপারফেক্ট। আর E-2 এর বৈশিষ্ট্য হলো– আনলিমিটেড, ইউনিভার্সাল, নন-পার্টিকুলার এবং পারফেক্ট। ইটস ফ্রি ফ্রম এনি সর্ট অব ইমপারফেকশান। তাহলে e-1 যখন E-2 সম্পর্কে জানতে চাইবে তখন E-2এর অস্তিত্বকে জানতে পারা ও এর কিছু বৈশিষ্ট্যকে নিজের মতো করে, অর্থাৎ e-1 সত্তা হিসাবে যে ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে পরিচিত সেটার মধ্য দিয়ে যা বা যতটুকু জানা বা অনুমান করা সম্ভব ততটুকুই সে জানতে পারবে।

আমরা জানি, আনলিমিটেড বলার পর তো কোনো কিছুকে কোয়ান্টিফাই করা কন্ট্রাডিক্টরি কাজ। তারপরও তো আমরা তা করি। নাম্বার ইনফাইনেট, এটা আমরা বলি। কিন্তু তারপরও তো আমরা নাম্বার কাউন্ট করি, প্লাস-মাইনাস ইত্যাদি ক্যালকুলেশন করি। তেমনিভাবে বুঝার সুবিধার্থে আমরা ধরে নেই, E-2-এর ক্যাপাসিটি ১০০। আর e-1 এর ক্যাপাসিটি ১০।

এখন ১০ ক্যাপাসিটির কেউ যখন তার পয়েন্ট অব ভিউ থেকে ১০০ ক্যাপাসিটির কোনো এনটিটিকে জাজ করতে যাবে, তখন সে যুক্তিসঙ্গতভাবেই কিছু জিনিস বুঝতে পারবে। আমাদের এই হাইপেথেটিকেল হিসেব অনুযায়ী যদি স্ট্যাটিসটিক্যালি ধরি তাহলে তা হবে ১০ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ E-2 এনটিটির ১০ ভাগের ৯ ভাগই কিন্তু সে ভুল বুঝবে অথবা বুঝবে না। যেটা সে বুঝবে না, সেটা সে নিজের মতো করেই বুঝে নেয়ার চেষ্টা করবে।

বিরক্ত না হলে আমি তোমাকে একটা উদাহরণ দেই। আমরা পেনড্রাইভ ব্যবহার করি। যে কোনোদিনই পেনড্রাইভ ব্যবহার করেনি তাকে যদি একটা পেন ড্রাইভ দেখিয়ে বলা হয়, এটি কী? সে এটাকে একটা কিছু বলবে বটে, কিন্তু পেনড্রাইভ তো বলবে না। পেন বা কলমের কথাই ধরো। যে এটি কোনো দিন ব্যবহার করেনি, যেমন একজন গুহাবাসী, সে যদি কলম দেখে, তার চোখের দৃষ্টি যদি ঠিকও থাকে, তারপরও সে কলমকে কলম হিসেবে আইডেন্টিফাই করতে পারবে না। সে হয়তো কলমকে একটা কাঠি বা অন্য কোনো একটা কিছু মনে করবে।

আচ্ছা, একটা ফানি সিনেমা আছে না ‘গডস মাস্ট বি ক্রেজি’, তুমি কি ওইটা দেখেছো? মরুভূমি পেরিয়ে আফ্রিকার এক সভ্যতাবিচ্ছিন্ন জনপদের উপর দিয়ে যখন বিমান যায় তখন তারা মনে করে, দেবতাগণ আকাশের উপর দিয়ে আসা-যাওয়া করছেন। এ রকম একবার একটি কাঁচের কোকের বোতল কেউ উপর থেকে ফেলেছে। মরুভূমির বালির মধ্যে যখন এটি পড়েছে, তা দেখে ওরা বলাবলি করছে, ‘গডদের তো মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তাঁরা এখন স্বর্গ থেকে আমাদের জন্য জিনিসপত্রও ফেলা শুরু করেছে।’ এখন এই কোকের বোতল নিয়ে তারা এখন কী করবে, এই নিয়ে খুব ফানি একটা সিনেমা।

কোকের বোতল নিয়ে তারা যেমন মহাঝামেলায় পড়ে গেছে, তেমনি যে বিষয়গুলোকে আমরা বুঝবো না, সেগুলোকে আমরা স্বভাবতই আমাদের মতো করে আইডেন্টিফাই করবো, আমাদের মতো করে লেভেল করবো।

আমরা ছোটবেলায় অডিও ক্যাসেট, ভিডিও ক্যাসেট ব্যবহার করতাম। পরে যখন সিডি-ডিভিডি বের হয়েছে, তখন গ্রামের লোকেরা একে বলতো ‘সিডি ক্যাসেট’। কারণ, সে আগেকার ক্যাসেট ধারণার সাথে পরিচিত। তারমানে, অপরিচিত একটি জিনিসকে মানুষ নিজের মতো করে বুঝে নেয়।

যে শব্দকে তুমি আগে কখনো শোনোই নাই, সেটি শোনার পর তুমি তোমার পরিচিত একটি শব্দের মতো করেই কিন্তু ইন্টারপ্রিট করবা। তাই না?

তাহলে হায়ার এনটিটির যে অংশগুলো আমি বুঝবো না, সেগুলোকে আমি কিন্তু আমার মতো করে ইন্টারপ্রিট করবো। এবং আমার দৃষ্টিতে কিন্তু আমি ঠিকই আছি। যদিও অভারঅল বা হলিস্টিক দিক থেকে আমার ভুল হচ্ছে।

৭. খোদা আমাদের তৈরি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য, কথাটা কতটুকু ঠিক?

এখন আমরা আবার গডের আলোচনায় ফিরে যাই। মানুষ যদি ফিজিক্যাল ও ইন্টেলেকচুয়্যাল ক্যাপাসিটির দিক থেকে লিমিটেড, পার্টিকুলার ও ইমপারফেক্ট হয়; তাহলে মানুষ কিন্তু খোদার সবকিছুকে বুঝতে পারবে না, তবে সে বুঝার চেষ্টা করবে এবং চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকগুলো বিষয়ে সে ভুল করবে। এই ভুল করার জন্য সে তার দিক থেকে টু সাম এক্সটেন্ট জাস্টিফাইড। ভুল করাই তার জন্য স্বাভাবিক। তাহলে আমাদের জন্য সবচেয়ে লজিক্যাল পজিশনটা কী দাঁড়ায়? লিমিটেড, পার্টিকুলার এবং ইমপারফেক্ট যে এনটিটি তথা e-1, তার পক্ষে E-2-কে হ্যান্ডেল করতে গিয়ে তার লজিক্যাল পজিশনটা কী হওয়া উচিত, তোমার মতে?

রুবায়েত: … করি, সেটা ভুলও হতে পারে। আমরা তো জানি না, এটা আদতে সঠিক কি না …

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও তো এটা করি। যে বিষয়টা আমাদের ক্যাপাসিটির বাইরে, সে বিষয়ে আমরা কোনো একজন এক্সপার্টকে এক্সপার্ট হিসেবে আইডেন্টিফাই করে তার উপর আমরা পুরোপুরি নির্ভর করি। যেমন, আমরা ডাক্তারের কাছে যাই। আমরা এক্সপার্টের মতামত নেই। আমরা এমনকি কোনো গাড়িতে ওঠে ড্রাইভারের পেছনে আরামে বসে থাকি। যদিও ড্রাইভার এক্সিডেন্ট করলে আমিও এফেক্টেড হবো। তারমানে আমাদের সামাজিক জীবনেও আমরা বিশেষজ্ঞ বা অথরিটির ওপর নির্ভর করি। সায়েন্স ল্যাবে আমরা যেটা চোখে দেখতে পাই না, সেটি দেখার জন্য মাইক্রোস্কোপ, টেলিস্কোপ বা বিভিন্ন অ্যাপারেটার্সের সহযোগিতা নেই। এখন মেশিনটা আমাকে ভুল রিডিং দিচ্ছে কি না, whether there is a ghost in the machine, I don’t know. But I rely on that. এবং এই নির্ভর করার জন্য আমি কিন্তু জাস্টিফাইড। তাই না?

তাহলে যে বিষয়গুলো আমি জানি না, সেগুলো জানার জন্য আমি কারো উপর নির্ভর করি। এখন যার উপর নির্ভর করছি, সে বিশ্বস্ত ও যোগ্য কি না, সেটা হল বিষয়। If he is competent enough then he will guide me properly; or, if he is not competent তাহলে সে আমাকে মিসগাইড করবে।

তাহলে মূল প্রশ্নে আসি। তুমি যেটা বলছিলা যে, তিনি আমাদেরকে কেন সৃষ্টি করেছেন?

আসলে তিনি কেন সৃষ্টি করেছেন, এর উত্তর আমার কাছে নাই এবং আমি শিওর যে এর উত্তর কারো কাছেই নাই। কারণ, কেন তিনি এ জগত সৃষ্টি করেছেন, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এখন তিনি যে বলেছেন, ‘তোমাদেরকে আমি ইবাদতের জন্য তৈরি করেছি’, এই উত্তরটা নিয়ে আমরা কী করবো? এই উত্তরটা তো আমাদেরকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করে না। এর সমস্যাগুলো তো আমরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি।

এর জন্য আমি তোমাকে আরেকটা টুল বলি। এগুলো চিন্তার কতগুলো নিয়ম আর কি। সেটি হলো plurality of causes। আমরা যখন কজালিটির কথা বলি, যেমন– Z এর কারণে Y হয়েছে, X এর কারণে Y হয়েছে। এটি হলো ওয়ান টু ওয়ান, ডাইরেক্ট কজালিটি। আরেকটি হলো, Yএর সৃষ্টিতে Xএর অবদান আছে। X has contributed in the making of Y। তারমানে, এখানে আরো কন্ট্রিবিউটররা কিন্তু আছে। তাহলে মনে করো, Y তৈরিতে A, B, C, D এবং X, এই পাঁচটি ফ্যাক্টর কাজ করেছে। এই পাঁচটি ফ্যাক্টরের কোনো একটিও যদি না থাকতো, তাহলে Y হতো না। তাহলে, Yএর কারণ কী? এখানে স্বতন্ত্রভাবে Xসহ A, B, C, D’র প্রত্যেকেই Y এর কারণ। মনে করো, পাঁচজন যৌথভাবে একটি প্রথম স্থান অধিকার করেছে। তাহলে ফার্স্ট হলো কে? ব্যক্তিগতভাবে কিন্তু পাঁচজনেই হয়েছে।

তাহলে কোনো কিছু হওয়ার জন্য যখন কারণ-সমষ্টি বা plurality of causes থাকে, তখন এর মধ্যে একটা ক্রমসোপান বা হায়ারআর্কি থাকবে। এই ক্রমিক ধারাবাহিকতা বা হায়ারআর্কির মধ্যে তুমি যখন কোনো একটা লেভেলকে এড্রেস করে বলবা, ‘হ্যাঁ, এটাই হলো কারণ’, তখন কিন্তু উত্তরটা টেকনিক্যালি কারেক্ট।

তো আল্লাহ তায়ালা ‘ইবাদতের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করেছেন’ কথাটা হলো তেমন ধরনের, টেকনিক্যাল অর্থে কারেক্ট। কিন্তু কেন তিনি আসলেই জগত ও মানুষকে তৈরি করেছেন, তা সত্যিকারভাবে জানতে হলে, মানে mind of God-কে রিড করতে হলে, বুঝতে হলে, আমাকে বা তোমাকে কিংবা যে বুঝতে চায় তাকে অবশ্যই একজন সমকক্ষ গড হতে হবে। কিন্তু, আগেই বলেছি, এটা কন্ট্রাডিকটরি।

কারণ, গড হতে গেলে সে আর he/she হতে পারবে না। যদিও আমরা আমাদের ভাষায় এর বাইরে অন্য কিছু ব্যবহার করতে পারছি না। ট্রান্সজেন্ডারকে তুমি যদি একটা জেন্ডারও ধরো, তাহলেও কিন্তু উপায় নাই। ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে গডের জন্য হি অর শি ব্যবহার করা আর জেন্ডার আইডেন্টি সম্পন্ন কারো গড হওয়া, দু’টি ভিন্ন বিষয়। আমরা জানি, জেন্ডার ডিপেনডেন্ট হলে, গডের সংজ্ঞানুসারেই কোনো লিঙ্গনির্ভর সত্তা আদৌ গড হতে পারবে না।

রুবায়েত: অনেক সময় দেখা যায়, আমরা … বলি, একজন। মানে ছোটবেলা থেকে শিখে আসি যে, তোমার স্রষ্টা একজন। তো, আমরা যে এখানে স্রষ্টাকে ‘জন’ হিসেবে অভিহিত করছি, মানে এটা…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তাঁকে ‘জন’ বলে আমরা পারসোনালাইজ করছি…

রুবায়েত: হ্যাঁ, …

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, এখানে পারসোনালাইজ করছি। এটা নিয়েও একটা কনসেপ্ট আছে। আমি এখানে লিখে রাখছি- Anthropomorphism। এই কনসেপ্টটাও আমাদের আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক। আমরা এই আলোচনায় পরে আসছি।

তাহলে, multiple of causes যখন থাকবে, তখন এর মধ্য থেকে কেউ যখন কোনো একটা কারণকে রিলেইট করে, তখন সেটি টেকনিক্যালি কারেক্ট। But this is not the total answer. তাহলে গড আমাদেরকে কেন তৈরি করেছেন, সেটা আসলে আমরা জানি না। এবং গড এভাবে না করেও অন্য কোনোভাবে করতে পারতেন, সেটা তিনি কেন করেন নাই, তাও আমি জানি না। কারণ, গডের মাইন্ড আমি রিড করতে পারি না। এটা আমার ক্যাপাসিটির বাইরে।

৮. জগত সৃষ্টির পূর্বে জাগতিক নিয়মাবলীর অস্তিত্ব থাকার তাৎপর্য ও আত্মস্বার্থবাদের গুরুত্ব

এখন আমি যখন আমার অবস্থান থেকে শুরু করবো তখন আমাকে বিবেচনা করতে হবে যে, আমি আমার অস্তিত্ব নিয়ে কি খুশি? নাকি অখুশি?

তুমি তো এখনও ছোট। ছোটদের একটা সুবিধা হলো যে তারা বড়দের তুলনায় খুব ফ্রেশ চিন্তাভাবনা করতে পারে। বড়রা কিন্তু অবসেসড বাই …। তুমি যখন আমার সাথে কথা বলছো, তখন কিন্তু আমার চিন্তা তোমার উপর প্রভাব সৃষ্টি করছে।

রুবায়েত: আপনি যেই প্রশ্নটা করেছিলেন, আমিও আমার ফ্রেন্ডকে ওই প্রশ্নটাই করেছিলাম… ফুটবল খেলার একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন না? ওইটা। আমিও তাকে সেইম কোয়েশ্চেনটা করেছিলাম, তো, ও আমাকে পাল্টা বললো, ফুটবল মাঠে এ রকমও তো করা যায়, দুইটা দলকেই সেটিসফাইড করলাম এভাবে যে, প্রথম ৪৫ মিনিট একটা দলকে সুযোগ দিলাম যে, তুমি প্রথমে কিক করো, আর দ্বিতীয় ৪৫ মিনিটে অপর দলটিকে সুযোগ দিলাম যে, তুমিই প্রথম কিক করো। এভাবে আমরা নিজেরা নিজেরাই জিনিসটা মিটিয়ে নিলাম।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, আমরা এ রকম মিটানোর চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু কোনো কোনো সময় আমরা এটি পারি না। কথার কথা, তুমি যতই এনভাইরনমেন্টাল ফ্যাসিলিটিসগুলো এনহ্যান্স করো না কেন, first half of the day is environmentally favourable and second half of the day is not so favourable; তাহলে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রণযোগ্য পরিস্থিতিতে ফেভারেবল অংশটা তুমি কাকে দিবা? তারমানে, there is always some uncertainty, you know.

আচ্ছা, আমি যেটা বলতে চাচ্ছি সেটা হলো, আসলে গড কেন আমাদের তৈরি করেছেন, ওভাবে না করলেও পারতেন, গডের আসপেক্ট থেকে যদি দেখি, তাহলে তাঁর পক্ষে সবই তো সম্ভব। কিন্তু আলোচনাটা শুরু করতে হবে আমার অস্তিত্ব থেকে। তুমি যে কোনো লোককে জিজ্ঞেস করো, সে তার অস্তিত্ব নিয়ে সুখী কিনা তাহলে কেউ বলতে পারে, আমার খুব দুঃখ। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে তুমি যদি তার সাথে কথা বলো তখন দেখা যাবে যে, তার রেজাল্ট খারাপ, তার বউ খারাপ, তার জামাই খারাপ, তার টাকা নাই ইত্যাদি। দেখা যাবে যে, আসলে তার দুঃখের কারণ হলো অন্যদের সাথে তার সম্পর্কের পাওয়া-না পাওয়ার ব্যাপারে। অন্যদের কাছ হতে পাওনা, প্রাপ্যতা ইত্যাদির প্রসঙ্গ বাদ দিলে তুমি দেখতে পাবে, সে কিংবা যে কোনো মানুষই তার অস্তিত্বকে ইতিবাচক হিসাবে গ্রহণ করে।

তাহলে আমাদের আলোচনাটি লজিক্যালি কারেক্ট হবে তখন, যখন আমরা একমত হবো যে, আমি জগতে আছি, এটি ঠিকই আছে। জগত আছে, তাও ঠিক আছে। জগত থেকে আমার হিসাব বা প্রত্যাশা মতো আমি পাচ্ছি না, সেটাই হয়তো আমাকে বা যে কোনো মানুষকে দুঃখিত করে।

এখন আমি ঠিক করবো যে, আমার সাথে জগতের সম্পর্ক কী হবে, আমার এবং জগতের উৎপত্তি এবং পরিচালনার জন্য আমরা কোনো হায়ার ফোর্সকে মানবো কি মানবো না। সেটি হলো আলোচনার বিষয়। তাহলে ‘ঈশ্বর কেন জগত সৃষ্টি করেছেন’, কিংবা, ‘এভাবে না করে অন্যভাবে করতে পারতেন’ এসব আলোচনা যদি আমাদের প্রেক্ষাপট থেকে আমরা দেখি, তাহলে আমাদের কাছে কিন্তু হিসাবটা মিলে যায়।

আচ্ছা মনে করো, গড আমাদেরকে তৈরি করে নাই। আমি একটা এথিস্টিক পজিশন নিলাম। ইনফ্যাক্ট, কেউ আমাদের তৈরি করে নাই। then I am left with the original question – who is me? Some atheist is always vulnerable to face the problem of explaining his/her own existence and explaining the cause of the world. জগত সৃষ্টির কারণ হিসেবে যদি বলা হয়, এটি নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, প্রকৃতির প্রকৃতি কী? বা প্রাকৃতিক নিয়মাবলী কোত্থেকে এবং কেন এমন হয়েছে? অন্য রকম কেন হলো না? কোনো কিছু হওয়ারই বা কী দরকার ছিল?

রুবায়েত: ফিজিক্সের ল থেকে হয়েছে, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমরা যদি বলি, সব ফিজিক্সের ল থেকে হয়েছে। তাহলে এটি একটি কন্ট্রাডিক্টরি কথা। কারণ, বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে ম্যাটার তৈরি শুরু হয়েছে। তাহলে ম্যাটার তৈরি শুরু হওয়ার আগে ম্যাটার তৈরির নিয়ম হিসাবে ফিজিক্সের নিয়মাবলী কেন থাকবে? ম্যাটেরিয়াল বা ফিজিকেল ওয়ার্লডই যদি না থাকে তাহলে ফিজিকেল ওয়ার্ল্ডের একটা নিয়ম, যেমন কোয়ান্টাম মেকানিক্স কেন থাকবে? কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন তো একটা ফিজিক্যাল। তাই না?

রুবায়েত: তাহলে স্যার, শূন্য থেকে যদি শুরু হতে হয়, তারমানে কী?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তারমানে শূন্যটা আসলে শূন্য নয়।

রুবায়েত: হ্যাঁ। আর যদি আমরা তারপরও ধরে নেই যে, শূন্য থেকে কিছু আসছে তাহলে প্রশ্ন হলো, প্রথমে তো টাইম ও স্পেস সৃষ্টি হয়েছে, তাহলে ওই টাইম ও স্পেস কোথায় ক্রিয়েট হয়েছে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এবং তুমি বলো যে, ওই শূন্যটার মধ্যে নিশ্চয় এ ধরনের তৈরি হওয়ার একটা পটেনশিয়ালিটি ছিলো। আমি যখন উপর থেকে পাথর ফেলি, এটি নিচে পরে। কিন্তু পাথরটি পরার আগেও এর মধ্যে শূন্যস্থান থেকে নিচে পতিত হওয়ার যে ফিজিক্যাল ল, সেটা তো পটেনশিয়ালি কার্যকর ছিলো। তাই না? তারমানে, কোনো কিছু একচুয়েলি হতে হলে তাকে আগে পটেনশিয়ালি থাকতে হয়। তাহলে জগত একচুয়েলাইজড হওয়ার আগে কোথায়, কোন সত্তার মধ্যে সেটা পটেনশিয়ালি ছিলো? এটি একটি সিরিয়াস প্রশ্ন নয় কি?

রুবায়েত: জ্বি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এখন কথা হচ্ছে আমি যদি আমার অবস্থান থেকে শুরু করি তাহলে আমি আমার অবস্থান থেকে জগতের সাথে কীভাবে কানেক্টেড হবো? আমার ও জগতের ব্যাখ্যাটা কীভাবে করবো? এটি আমাদের জন্য একটা বিরাট সমস্যা।

এ জন্য আমরা গডের অস্তিত্বকে যদি আমরা ‘গড হাইপোথিসিস’ হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে আমাদেরকে ভালো করে বুঝতে হবে, আমাদের ক্ষমতা দিয়ে আমরা গডকে fully conceive করতে পারি না। এই না পারাটাই আমাদের জন্য যুক্তিসঙ্গত। আমরা যদি গডকে প্রপারলি আন্ডারস্ট্যান্ড করতে পারি, তাহলে কিন্তু সেটা তাঁর গডশিপকেই বাতিল করে দেয়। মনে করো, গড এসে যদি বলে, ‘লুক অ্যাট মি, আই অ্যাম গড!’ রোমান গডের মতো, বা হিন্দুদের দেবতার মতো; তাহলে আমরা বলতে পারি, গড হাইপোথিসিস অনুসারে গড তো সীমাবদ্ধ বা বস্তুগত হওয়ারই কথা না। অতএব, এটি নিশ্চয়ই ভূয়া গড।

ঈশ্বরের ধারণা বা গড হাইপোথিসিস এসেছে জগতকে ব্যাখ্যা করার জন্য। If God is a part of the world, then He is not a true God. সে জন্য গডের বিষয়গুলোকে আমরা আমাদের অবস্থান থেকে যদি ব্যাখ্যা করি, তাহলে গডের অনেকগুলো বিষয় আমরা বুঝতে পারি না। এবং সেগুলো আমাদের কাছে ভুল মনে হয়।

যেমন, জগতে তিনি অমঙ্গল তৈরি করলেন কেন? জগতের সবকিছুই মঙ্গলময় হলো না কেন? আমরা হয়তো এ ধরনের প্রশ্ন করতে পারি। কিন্তু তুমি-আমি যেটাতে একমত হলাম, আমার মনে হয় যেন জগতের সেরা নাস্তিকও এরসাথে একমত হবে, ওই যে অন্টোলজি… মানে, নেগেটিভ ছাড়া পজেটিভ হবে না। তুমি যদি একটা সর্বমঙ্গলময় জগত কল্পনা করো, তাহলের মঙ্গলের ধারণাটা কোত্থেকে আসবে, যদি সেখানে কোনোক্রমেই কোনো ধরনের অমঙ্গল না-ই থাকে? কোনো অমঙ্গল ছিলো না, কোনো অমঙ্গল নাই, অমঙ্গল হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নাই– এমন একটা মঙ্গলময় জগতে কিন্তু মঙ্গলের মঙ্গলত্বও আর বুঝা যাবে না।

তাহলে জগতের প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করলে আমরা দেখবো– জগতটাকে আল্লাহ তায়ালা কেন এভাবে করেছেন, অন্যভাবে কেন করেন নাই, কেন জগতের মধ্যে অমঙ্গল তৈরি করেছেন, এই সবগুলো ‘কেন’র উত্তর কিন্তু আমাদের কাছে নাই। কিন্তু এগুলো আমরা পাওয়ার চেষ্টা করছি, যতটুকু আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব।

৯. ফ্রম ওয়ার্ল্ড টু গড বনাম ফ্রম গড টু দ্যা ওয়ার্ল্ড এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বিবেচনা

তিনি তো জগত তৈরি করলেন, ভালো কাজ করার নির্দেশ দিলেন, না করলে শাস্তির ব্যবস্থা করলেন; কিন্তু এসব না করে দুনিয়ার সবাইকে বেহেশতে নিয়ে রাখলে অসুবিধা কী ছিলো? কিছু মানুষকে জাহান্নামের মধ্যে পোড়ানোর বিষয়টা আমাদের কাছে কি খুব খারাপ মনে হয় না? এটা আসলে আমার কাছেও কষ্টদায়ক কল্পনা অর্থে খারাপ মনে হয়। কিন্তু আমি দেখবো যে, আমি বা দুনিয়ার কোনো মানুষ কি জাহান্নামে যেতে চায়?

মনে করো, নাস্তিকদের বলা হলো যে, ধরে নাও যে একটা নরক আছে। So you make a choice, to go to hell or to paradise. আমার মনে হয়, একজন মানুষও কিন্তু নরকে যাওয়ার ঘরে টিক চিহ্ন দিবে না। দোযখ আছে এটি নিশ্চিতভাবে জানতে পারলে সবাই-ই দোযখ থেকে বাঁচতে চাইবে। প্যারাডাইসে যাওয়ার ঘরেই সবাই টিক চিহ্ন দিবে। এর কারণ হলো, মানুষের যে বৈশিষ্ট্য– মানুষ সুখ চায়। এখন, সুখ চাইতে হলে ভালো কাজ করতে হবে। ভালো কাজ করার জন্য ইসলামের নীতি হলো, ভালো কাজের নিয়ত করা মাত্রই সেটি তোমার জন্য কাউন্টেড হবে, আর খারাপ কাজ করার পরই কেবল সেটি কাউন্ট হবে। এরপর তুমি আবার তওবাও করতে পারো।

রুবায়েত: এখানে মানুষ কী চায়, এই ধারণাটাও তো …

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এই ধারণাটা তো মানুষ নিজের দিকে তাকালেই বুঝতে পারে। মনে করো, তুমি যদি…

রুবায়েত: সেটা ঠিক আছে। কিন্তু মানুষ যে বুঝতে পারে এই প্রবণতাটাও তো ক্রিয়েট হয়েছে…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, এটা গিভেন। গিভেন বাই ন্যাচার অর গড, হোয়াটেভার।

রুবায়েত: হ্যাঁ। তো, এখন আমি যদি বলি যে, হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারি। তো, এই বুঝতে পারার জন্যও তো স্রষ্টা, মানে …

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমরা গড বলি, বা ন্যাচার বলি, যাই বলি না কেন, বুঝতে পারার জন্য তো গডই দায়ী।

রুবায়েত: হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাহলে এখানে তো আমাদের কোনো ভূমিকা নাই। বা আমি জান্নাত বা জাহান্নামে…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তুমি তোমার অজান্তেই আরেকটা প্রশ্নে চলে গেছো। যেটা খুব কমন একটা প্রশ্ন। সেটি হলো তাকদীর বা predestination বা ইচ্ছার স্বাধীনতার প্রশ্নের মধ্যে তুমি চলে গেছো।

আমরা আগে যে কনট্রাস্টটা আলোচনা করেছিলাম– man vs God, অথবা বলা যায় world vs God; এই রিলেশনে গডের দিক থেকে কোনো কিছু কি ফ্রি হওয়া সম্ভব? মানে God is all powerful, i.e. Omnipotent, but men are free, এইটা কী করে সম্ভব? মানুষ আমল করুক। এরপর তিনি জানবেন, মানুষ কী করেছে। এরপর এর ভিত্তিতে তিনি তাঁর করণীয় ঠিক করবেন, গড হাইপোথিসিস অনুসারে, অর্থাৎ গডের দিক থেকে এই ধারণাটা কি কনসিসটেন্ট?

রুবায়েত: না, স্যার। গডের দিক থেকে তো এটি কনসিসটেন্ট বলে মনে হয় না।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: গডের দিকে থেকে এই ধারণাটা কনসিসটেন্ট নয়। তাহলে, গডের দিক থেকে গডকে গড হতে গেলে He has to be ALL POWERFUL and ALL KNOWING. এবার মানুষের দিক থেকে দেখো। মানুষ যা কিছু করে এগুলো God has created, directly or indirectly or God…

রুবায়েত: তাহলে তো গডের যে নিজস্ব সত্তা বা গডের যে নিজস্ব থিংকিং পাওয়ার সেটিও, মানে ওই পাওয়ারটা ফেস করার সক্ষমতা আমাদের নেই। আমরা গডের যে পাওয়ারটা ফেস করতেছি…সরি, যে থিংকিং পাওয়ারটা ফেস করতেছি সেটা শুধুমাত্র, মানে আমরা … আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সক্ষমতা অর্জন করার মতো ছিলো, আমরা গড থেকে ততটুকু অর্জন করে নিয়েছি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, গড থেকে পেয়েছি…

রুবায়েত: হ্যাঁ, পেয়েছি। তো আমরা এটা বলতে পারি না যে গড আমাদের এখানে…? কারণ, গডের থিংকিং পাওয়ার যদি আমাদের এখানে আসতে পারে, তাহলে গড নিজেও আমাদের এখানে আসতে পারে। … তারমানে গডের প্রকৃত থিংকিং পাওয়ারটা আমাদের এখানে আসে নাই, বরং আমরা অর্জন করে নিয়েছি এটা।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: অর্জন করে নিয়েছি অথবা যতটুকু আমাদের দেওয়া হয়েছে।

রুবায়েত: হ্যাঁ, যতটুকু আমাদের দেওয়া হয়েছে। মানে, যেটা পাওয়ার মতো ছিলো…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তাহলে, আমি তোমাকে যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, সেটা হচ্ছে, খোদার দিক থেকে জগত-এই দৃষ্টিকোণ বনাম জগতের দিক থেকে খোদার কার্যক্রম বা খোদা কেমন, এই দুইটা দৃষ্টিভঙ্গী পৃথক বিষয়।

from God to world, যা আমরা প্রথমে আলোচনা করেছি। গডের দিক থেকে ওয়ার্ল্ডের মধ্যে independent, free কোনো কিছু হওয়াটা অসম্ভব। কারণ, God is SUPREME and the world is within the capacity of God.

from world to God যদি আমরা দেখি, তাহলে আমরা একটা লজিক্যাল প্রবলেম দেখতে পাই। সেটা হচ্ছে, ওয়ার্ল্ডের সবকিছু যদি গড দ্বারা ডাইেরক্টলি পরিচালিত হয় (অবশ্য ইনডাইরেক্টলি হলেও কোনো অসুবিধা নাই), তাহলে আমরা যা কিছু করি সেগুলো তো মূলত আল্লাহর ইচ্ছাতেই করি। আল্লাহর হুকুমের বাইরে তো কোনো কিছুই হয় না। তাহলে আমি যে পাপ করি, সেটার জন্য আমি কেন দায়ী হবো?

রুবায়েত: আচ্ছা, ওইটা তো তাকদীরের বিষয়ে চলে গেছে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, সেটাই তো। তুমি তো মূলত ওই বিষয়েই আমাকে প্রশ্নটা করেছো। তুমি এর আগে যেটা বলেছো যে, আমরা যে ভোগান্তি বা শাস্তির সম্মুখীন হই…। তিনি আমাদেরকে একটা আদেশ দিয়েছেন, তারপর সেটি ভুলিয়ে দিয়েছেন, তারপর আবার তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এই আদেশ না মানলে আবার শাস্তি দিচ্ছেন। এই জিনিসগুলা কেন?– এটা তোমার প্রশ্ন ছিলো। এই প্রশ্নটা আসলে মূলত তকদীরের সাথে সংশ্লিষ্ট। এখন আমরা যখন world to God পারস্পেকটিভ থেকে দেখি, অর্থাৎ আমাদের অবস্থান থেকে দেখি যে, আমাদের সবকিছু গড দ্বারা পরিচালিত, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। অথচ মাঝখান থেকে আমরা দায়ী হচ্ছি। এটা কিন্তু একটা এপারেন্ট কন্ট্রাডিকশন তৈরি করছে।

এমতাবস্থায় অর্থাৎ, evil থাকার কারণে আমাদের মনে হচ্ছে, আসলে গড একজিস্ট করে না। যদি করতো তাহলে তিনি কেন এভিল এলাউ করলেন? শয়তানের যদি মানুষকে বিভ্রান্ত করার ক্ষমতা থাকে এবং সেই ক্ষমতা যদি আল্লাহই দিয়ে থাকেন, তাহলে আল্লাহই তো শয়তানকে দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করিয়ে একটা শাস্তির ব্যবস্থা করছেন! তাই না?

রুবায়েত: জ্বী। তারপর স্যার, আমি এই জিনিসটা নিয়ে একটু ভাবছিলাম যে, বলতে গেলে ইবলিস অনেকটা মানুষের জন্য কল্যাণকরই। আমি একটু অন্যদিক থেকে ভাবছিলাম যে, … আমরা যেসব পাপ কাজ করে থাকি, ওইসব পাপ কাজের দায়টা আমরা কার উপর দিতে পারছি? মানে…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আরেকজনের ঘাড়ে চাপাইতে পারছো, কিন্তু তাতে… (হাসি)

রুবায়েত: আমার ঘাড়ে … দায় চাপবে… যেমন, মানুষ যা করে কর্মের ফলই সে ভোগ করে। তারমানে, মানুষ যা কিছু করে… ওইখানেই… প্রকৃতি ঐটা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। যদিও ইচ্ছাটা স্রষ্টার, কিন্তু এগুলো ঘটে মানুষের কারণেই আর কি। এখন যদি ইবলিস না থাকতো, তাহলে মানুষের কাজের দায় শুধু মাত্র মানুষের ঘাড়েই চাপতো…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তাহলে ইবলিসকে তুমি scapegoat করছো?

রুবায়েত: জ্বী স্যার?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: scapegoat বলে একটা কথা আছে না? মানে, বলির পাঁঠা।

রুবায়েত: স্যার, এখানে তো ইবলিস নিজেই এসে এই…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হুম, ইবলিস বোকামিটা করছে। ইবলিস যে বোকামিটা করছে সেটা কি আল্লাহর হুকুমের বাইরে করেছে? আল্লাহ তো ALL POWERFUL।

রুবায়েত: তাকেও তো মাইন্ড দেয়া হয়েছে। …

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ঠিক আছে, তাকে মাইন্ড দেয়া হয়েছে। তাহলে, তার মাইন্ড ব্যবহার করে সে কী করবে, সেটা কি আল্লাহ জানতেন? নাকি, জানতেন না? আমরা কিন্তু আবার omnipotent paradox-এ চলে গেছি। কারণ, তুমি যদি বলো, আল্লাহ জানতেন না; তাহলে আল্লাহ সবজান্তা কীভাবে হলেন? আর আল্লাহ যদি জানতেনই যে ইবলিস তার মাইন্ডকে ব্যবহার করে এ রকম ইবলিসি করবে, তাহলে আল্লাহই তো একটা গেইম করলেন। (হাসি)

রুবায়েত: আচ্ছা স্যার, বুঝতে পারছি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তাহলে এটুকু বুঝছো যে, এথিস্টিক আর্গুমেন্টগুলো আমি এথিস্টদের চেয়ে ভালো বুঝি (হাসি) এবং বলতে পারি।

১০. অমঙ্গলের সমস্যা (problem of evil)

এনিওয়ে,আ যেটা বলতে চাচ্ছি, আমাদের দিক থেকে যখন আমরা আল্লাহকে দেখি, তখন আমরা কিন্তু অনেকগুলো প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাই না যে কেন তিনি এটা করলেন। ওই যে একটা গানের মধ্যে আছে না– ‘সর্প হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়ো ঝাড়ো’– ওরকম একটা ব্যাপার বলে আমাদের কাছে মনে হয়।

এবার আসো রেশনাল স্কেল বা রেশনালিটির মানদণ্ড সম্পর্কে। এখানে দুটি স্কেল আছে। একটা হলো মানুষের স্কেল, আরেকটা হলো গডের স্কেল। তাহলে গডের একটা Godly Rationality থাকার কথা, মানুষের যে রকম আছে মানবিক বিবেচনাবোধ।। এখন আসো আমরা বুঝার চেষ্টা করি, মানুষ এবং গডের র‍্যাশনাল স্কেল কি এক বা আইডেন্টিকেল?

রুবায়েত: না, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এক নয়। তাহলে মানুষের স্কেলে যেটা ভুল দেখা যাবে, গডের স্কেলে সেটি ভুল দেখা যেতেই হবে, না হলে গড খারাপ, আমরা কি এটা বলবো? নাকি বলবো, মানুষের স্কেলে যেটা ভুল দেখা যাচ্ছে, গডের সাথে যেটা মিলছে না, সেটি আসলে সত্তাগত পার্থক্যের কারণে। ওই যে আগে আমরা যে বলেছি Entity of God হচ্ছে আনলিমিটেড, ইউনিভার্সাল এবং পারফেক্ট, যদি গড থেকে থাকেন। তাহলে আমাদের স্কেলে আমরা যেটাকে এভিল বলছি, সেটা আসলেই এভিল কি না? আমাদের দৃষ্টিতে এভিল মনে হওয়াটা যদিও ঠিকই আছে।

যেমন– এক বিধবার একমাত্র ছেলেটা এক্সিডেন্টে মারা গেলো। এটি যে অন্যায় এবং জুলুম হয়েছে, মহিলাটা যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমাদের দৃষ্টিতে এই কাজটা যে একটা এভিল – এটা তো অস্বীকার করার কোনো পথ নাই। কোনো ধর্মের নামে, কোনো কিছুর নামেই তুমি এটাকে মঙ্গলজনক প্রমাণ করতে পারবে না। কিন্তু জগতের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এটা এভিল কিনা সেটা বলতে হলে আমাদের কিন্তু সামগ্রিক প্রেক্ষাপটটা জানতে হবে। কারণ, আমরা হয়তো দেখি, একটা বিল্ডিংয়ের কোনো একটি পিলার না থাকলে হতো বিল্ডিংটা অনেক সুন্দর হতো, দূর পর্যন্ত দেখা যেতো। অর্থাৎ, আমাদের বাহ্যিক দৃষ্টিতে পিলারটি না থাকলেই ভালো হতো। কিন্তু পিলারটা না থাকলে পুরো বিল্ডিংটাই যে ভেঙ্গে পড়তো তা জানতে হলে আমাদের তো পুরো বিল্ডিংটা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

রুবায়েত: হ্যাঁ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কিংবা ধরো, গাড়িতে ওঠতে পারি নাই বলে আফসোস করেছি। পরে জানা গেলো, কিছুদূর গিয়ে গাড়িটা এক্সিডেন্ট করেছে। তাহলে আমি যদি হোলিস্টিক এপ্রোচে, মানে অনেকটুকু বা পুরোটা জানতে না পারতাম তাহলে আমি কিন্তু সবসময় মনে করতাম, ‘ইশ! গাড়িটা পাই নাই, আফসোস! গাড়িটা ধরতে পারলে আমি পৌঁছাতে পারতাম।’ অর্থাৎ, গাড়িটা যে এক্সিডেন্ট করছে সেটা যদি আমি না জানি তাহলে তো আমার গাড়ির জন্য আফসোস হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাহলে, আমরা যেটাকে এভিল বলি, সেটা আমাদের দৃষ্টিতে এভিল মনে হওয়াটা ঠিকই আছে। কিন্তু এটা সত্যিকার অর্থেই এভিল হওয়ার জন্য…।

কারণ, জগতের কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়। তুমি সায়েন্সের ছাত্র হওয়ার কারণে তোমাকে আরেকটা জিনিস বলছি। সেটা হচ্ছে mathematics of chaos. এটা কোয়ান্টাম ফিজিক্সের সাথে কমপেটেবল। ওখানে বলা হচ্ছে, জগতের সকল ঘটনাই হচ্ছে পরম মাত্রায় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ super symmetrical…। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, আটলান্টিক মহাসাগরের এপারে একটা butterfly তার ডানা ঝাপটাচ্ছে এবং এটার এফেক্টে দেখা গেছে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে একটা সাইক্লোন হয়ে গেছে।

রুবায়েত: স্যার, একটা কণার এক্সপেরিমেন্ট দেখছিলাম ইউটিউবে। মানে একটা ফোটন কণার এক্সপেরিমেন্ট দেখছিলাম…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, ওটা double slit experiment। মানে তুমি কণাটা ছুঁড়ে দেয়ার পর কণাগুলো এক জায়গায় না পরে একটা প্যাটার্ন অনুযায়ী পরে। ওটার কথাই তো বলছো, নাকি?

রুবায়েত: জ্বী স্যার, ওইটার কথাই বলছি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ওটাকে বলে double slit experiment. মানে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের নিয়মগুলো যে ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের নিয়মে চলে না, তা বুঝানোর জন্য একটা এক্সপেরিমেন্ট আর কি।

যা হোক, আমি তোমাকে যা বলছিলাম যে, জগতের কোনো ঘটনাই কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়। আমারা মনে করতে পারি, বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যে যে বলয়গুলো আছে, এগুলোর কাজ কী? পরে বিজ্ঞানীরা দেখলো, ওই বলয়গুলো না থাকলে অনেক কসমিক উপাদান প্ল্যানেট আর্থকে হিট করতো। ওই বলয়গুলো সেসব আঘাত থেকে আমাদেরকে রক্ষা করে। তাই আমরা যেগুলোকে অপ্রয়োজনীয়, ভুল বা এভিল বলছি; সেগুলোকে যদি হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ থেকে দেখতে পারি তাহলে কেবল বুঝা যাবে, আমাদের এই মনে করাটা কতটুকু সঠিক, কতটুকু ভুল।

গডের অবস্থান থেকে দেখলে মনে হবে, সবকিছু নির্ধারিত হওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত। আর আমাদের অবস্থান থেকে দেখলে মনে হবে, সবকিছু নির্ধারিত হলে পুরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা কেন থাকবে? এই ধাঁ-ধাঁ বা riddle-টা কিন্তু আমরা সলভ করতে পারি না। আমার কাছে এটা এক ধরনের গোলক-ধাঁধাঁ বা রিডল। আমার মনে হয়, কোনো মানুষের পক্ষে এই রিডল সমাধান করা সম্ভব নয়।

তাহলে আমরা কী করবো?

আমরা কিন্তু আমাদের সেই অরিজিন্যাল জায়গাতে ফিরে আসবো – আমি। আমি আসলে পুরস্কৃত হতে চাই, নাকি শাস্তিপ্রাপ্ত হতে চাই? ডেফিনিটলি আমি পুরস্কৃত হতে চাই। তো পুরস্কৃত হতে চাইলে আমি ভালো কাজ করবো। যেহেতু আমি জানি যে, ভালো কাজ করলে আমি পুরস্কৃত হবো। এখন আমি ভালো কাজ করতে চাই কি না? এবং ভালো কাজ করার ক্যাপাসিটি আমার আছে কি না? এটা হলো বিষয়।

১১. মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা থাকাটা হলো প্রায়োগিক সত্য বা empirical truth এবং একে অস্বীকার করা স্ববিরোধিতার নামান্তর

তোমার ডিটারমিনিজম সংক্রান্ত প্রশ্নের আরেকটা রেসপন্স হলো– মনে করো, এই যে আমি তোমার সাথে কথাগুলো বলছি, এই কথাগুলো আমার গলার ভোকাল কর্ড দিয়ে বের হচ্ছে। তাই না?

রুবায়েত: জ্বী স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আচ্ছা, ভোকাল কর্ডটা যদি এখন যেভাবে কাজ করছে সেভাবে কাজ না করে অন্যভাবে কাজ করতো, তাহলে এখন শ্রবণযোগ্য যে সাউন্ডটা তোমার কাছে প্রডিউস করছি, এটা তো করতে পারতাম না।

রুবায়েত: না, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আচ্ছা। আমার এই ভোকাল কর্ডকে নিয়ন্ত্রণ করছে আমার ব্রেইন। আমার ব্রেইন থেকে যেই কমান্ডটা আমার ভোকাল কর্ডকে দিচ্ছে, ভোকাল কর্ড সেভাবেই কিন্তু বড়-ছোট হচ্ছে, যার কারণে এই সাউন্ড ওয়েভগুলো তৈরি হচ্ছে। Am I right?

রুবায়েত: জ্বী, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আচ্ছা। (হাসি) সায়েন্স পড়া খুব দরকার, সাথে একটু ফিলোসফি পড়া ভালো। তো, যেটা বলছিলাম। আমার ব্রেইন আমাকে এই কমান্ডটা কেন দিচ্ছে?

রুবায়েত: এটাই তো কথা স্যার, ব্রেইন কেন দিচ্ছে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমি যে তোমার সাথে কথা বলছি, এজন্য আমার ব্রেইন একটা স্পেসেফিক কমান্ড দিচ্ছে। যার কারণে আমার গলার স্বর এক রকম, তোমার গলার স্বর আরেক রকম। আমার কথাগুলো এক প্যাটার্নে হচ্ছে, তোমার কথাগুলো আরেক প্যাটার্নে হচ্ছে। তাই না? এটা তো আমাদের ব্রেইন নিয়ন্ত্রণ করছে। ব্রেইন যদি কমান্ডটা না দিতো, তাহলে আমি চাইলেও…।

অনেক সময় দেখা যায় কোনো ফিজিক্যাল প্রবলেমের কারণে কারো এ রকম হয়। যেমন–আমার এক আত্মীয়কে দেখতে গিয়েছিলাম। সম্পর্কে আমার খালা। তিনি কথা বলতে পারছেন না। আমার খালাতো ভাই জানালো, একটা ঔষধের কারণে উনার জিহ্বাটা ভারী হয়ে গেছে, তাই তিনি কথা বলতে পারছেন না। তিনি কিন্তু মনে মনে কথা বলেই যাচ্ছেন। কিন্তু তার গলা দিয়ে তা বেরুচ্ছে না। তাই না?

রুবায়েত: জ্বী।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তাহলে আমার গলা দিয়ে যা বেরুচ্ছে সেটা কিন্তু আমার ব্রেইন প্রডিউস করছে। এখন তুমি-আমি যে কথা বলছি, এখানে আমাদেরকে কেউ কি বাধ্য করেছে কথা বলার জন্য, নাকি আমরা আউট অব ইন্টারেস্ট আমাদের ফ্রি উইল থেকে কথা বলছি?

রুবায়েত: ইন্টারেস্ট এবং ফ্রি উইলের কারণে আমরা কথা বলছি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এখন তুমি আমার সামনাসামনি থাকলে দেখাতাম যে, তুমি যদি নিজের হাতটা উপরের দিকে তোলো আর নামাও, you can do it with your own capacity.

রুবায়েত: জ্বী, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: So, we have freedom of will, we have our limited autonomy. তারমানে, আমাদের যে ইচ্ছার স্বাধীনতা আছে, আমাদের সীমিত হলেও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আছে, এটা তো একদম অভিজ্ঞতাগত তথা এম্পিরিকাল, প্র্যাকটিকাল, এবং ডেমোনেস্ট্রেটিভ ট্রুথ। এটাকে অস্বীকার করার কোনো পথ নাই।

অতএব, মানুষের দিক থেকে, মানে আমরা যদি জগতের দিক থেকে যখন আল্লাহর দিকে দেখি, তাহলে কেন আল্লাহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, সেটার মধ্যে কেন ভালো-মন্দ দুইটাই আছে; তার সত্যিকার কোনো সমাধান বা উত্তর আমরা পাই না। তাত্ত্বিকভাবে এটা আমাদের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়।

এই কারণে আমরা যদি বলি, আসলে গডের ধারণাটাই কন্ট্রাডিকটরি, তাহলে কিন্তু আবার আমি ব্যাক করবো, আমার নিজের এবং জগতের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করার প্রশ্নের মধ্যে। সেটা নিয়ে আমি নতুন করে আলোচনা রিপিট করতে চাচ্ছি না।

আমরা যদি বলি– আমাদের ফিজিক্যাল ও মেন্টাল গিভেন ক্যাপাসিটি কম হওয়ার কারণে আমরা তাত্ত্বিকভাবে সবকিছু বুঝতে পারছি না বটে, তবে প্র্যাকটিকালি আমরা বুঝতে পারি যে অস্তিত্বশীল হওয়ার কারণে আমরা আদতে লাভবান হয়েছি, আমরা পেয়েছি সুযোগ। এবং আমাদের আছে আমাদের লক্ষ্য অর্জন করার মতো স্বাধীনতা।

তুমি যেই কথাটা বলেছো সেই লাইনে যদি আসি, একটু ঘুরিয়েই যদি বলি, সেটা হচ্ছে অন্টোলজি। ওই যে অন্টোলজির কথা বললাম। জগতের মধ্যে যদি কোনো মন্দ না-ই থাকতো, তাহলে ভালোটা কীভাবে ভালো হতো? শয়তান যদি না-ই থাকতো, তাহলে কাকে আমরা বলির পাঁঠা বানাতাম?

১২. গডের বৈশিষ্ট্য মানুষের মতো কেন? তাতে কি বুঝা যায় না যে ঈশ্বরের ধারণা নিছকই মনুষ্য কল্পনা?

তোমার লাস্ট কথাটা নিয়ে এবার বলি। আমি একটা শব্দ বলেছিলাম– এনথ্রোপমরফিজম। এনথ্রোপমরফিজম মানে হচ্ছে, মানুষ যা কিছু কল্পনা করে, ভালো হোক, মন্দ হোক, শয়তান হোক, খোদা হোক আর দেবতা হোক অথবা যা-ই হোক, মানুষ যা কিছুই কল্পনা করে সেটা মানুষের অবয়বেই করে। তুমি দেখবা, যত এলিয়েনের ছবি এ পর্যন্ত আঁকা হয়েছে, সেগুলো কোনো না কোনো ফরম্যাটে মানুষেরই মতো। এমনকি মানুষ যখন ঈশ্বরকে কল্পনা করে, তাও কিন্তু মানুষের মতোই। যে ধর্মেরই বলো না কেন, মানুষ যখন ঈশ্বরকে কল্পনা করে, বিশ্বাস করে, ঈমান আনে , যেভাবেই বলো না কেন, সেটা কিন্তু হয় মানুষেরই মতো।

অর্থাৎ, মানুষের চিন্তাটা মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। মানুষ যে ঈশ্বরকে মানুষের মতো কল্পনা করে, এটা মানুষের একটা কমন বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যটা মানুষ কখনো অতিক্রম করে যেতে পারে না। মানুষ মানুষের বাইরে কিছু ভাবতে পারে না। আর এটা তো খুবই লজিক্যাল। X কখনো Y হবে না। X যদি Y-কে ধারণ করেও, তাহলে X তাকে নিজের মতো করেই আত্মস্থ করেই তবে গ্রহণ করবে। নচেৎ, X, Yএর যথার্থ সম্মিলন, সংযোগ বা মিলন হয়ে উঠবে না।

আমরা খোদাকে যেভাবে কল্পনা করি, তাতে দেখা যায়, খোদা কিন্তু আমাদেরই মতো। ওই যে তুমি যে বলেছো, খোদাকে আমরা ‘জন’ বলি। কোরআন শরীফেও আছে, তিনি ক্ষুদ্ধ হন, তিনি সন্তুষ্ট হন। মানুষের অনেক বৈশিষ্ট্যও আমরা ঈশ্বরের উপর প্রয়োগ করি। এমনকি ইসলামেও করি। যদিও আমরা হিন্দুদের মতো দেবতা বানাই না। তবে আমরা কিন্তু আমাদের মতো করেই বিশ্বাস করি বা ধারণা করি।

আমরা আমাদের মতো করে যা কল্পনা করি, মুসলমানরা বিশ্বাস করে সেটা আসলেও ঠিক তাই। আর অন্যরা বলে– না, এটা শুধুই তোমাদের একটা কল্পনা মাত্র। যেটা তোমাদের ভালো-মন্দের সাথে রিলেটেড। বাস্তবে এ রকম কোনো কিছু নাই। এখন বার্ডেন অব প্রুফ তথা প্রমাণের দায়িত্ব কিন্তু যে ‘আছে’ বলে তার উপর যতটুকু, যে নাই বলে তার উপরও ততটুকু।

আমরা মনে করি, আমরা ঈশ্বরকে যেভাবে কল্পনা করি ঈশ্বর আসলেই তেমন। কিন্তু ইসলাম বলে, আল্লাহর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাঁর জাত বা সত্তাগত। এই জাত সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা মানুষের পক্ষে অসম্ভব, যেহেতু মানুষ ইনক্যাপাবল বা লিমিটেড পার্টিকুলার এনটিটি। আর আল্লাহর কিছু সিফাত তথা গুণাবলী আছে, যেগুলোর মাধ্যমে আমরা আল্লাহকে জানতে পারি।

তাহলে আল্লাহর যেসব গুণ সম্পর্কে আমরা জানি সেগুলো কিন্তু জগতেরই প্রেক্ষাপটে, জাগতিক ভাষায়, জাগতিক উপমা দিয়ে বর্ণিত। যেমন, আল্লাহ সর্বশক্তিমান। এখন দুনিয়াটাই যদি না থাকতো তাহলে আল্লাহর সর্বশক্তিমান হওয়াটা অর্থহীন হতো। তাহলে জগত আছে বলেই আমাদের বুঝার জন্য প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন ঐশী বৈশিষ্ট্য আমরা জগতের প্রেক্ষাপটে বুঝতে পারি।

রুবায়েত: তাহলে এখন মনে করি, জগত নাই। কিন্তু তখন স্রষ্টা কি থাকবে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: জগত না থাকলে স্রষ্টা থাকা বা না থাকার প্রশ্নটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

রুবায়েত: না, স্যার। আমরা তো বলি– একটি জগত আছে, যেটি একজন সর্বশক্তিমান পরিচালনা করেন। কিন্তু ধরে নিলাম, জগত নেই, শুধু একজন স্রষ্টা আছেন। তখন তো তিনি বলতে পারবেন না যে, আমি প্রতিপালক।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমরা যদি বলি, God without world, তাহলে গডের যত এট্রিবিউট, ক্যারেক্টারিস্টিকস, কোয়ালিটি ইত্যাদি, এই সবগুলো অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার কারণে এবং সেই অর্থে কলাপস করবে। এগুলো সব কন্ট্রাডিকটরি ও মিনিংলেস হয়ে পড়বে। কিন্তু এই আলোচনাতে আমরা সেদিকে কেন যাবো? কারণ, আমরা তো ‘আমি এবং জগত’ এই প্রেক্ষাপটে গড নিয়ে আলোচনাটা শুরু করেছিলাম।

রুবায়েত: গড যে সর্বশক্তিমান, এই ধারণাটি আমাদের মনে আসে কোত্থেকে? কারণ, মানুষের শক্তি আছে, এনার্জি আছে…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: রাইট। মানুষের এনার্জি আছে। কিন্তু মানুষের এনার্জির লিমিটেশন আছে।

রুবায়েত: কিন্তু আমরা এ রকম একটা সত্তা চাই, যার এনার্জি আমিও…।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: রাইট। এটা মানুষের সাইকোলজির মধ্যে আছে। সে এমন একটা পাওয়ারফুল এনটিটির এজেন্ট হতে চায় যেটা তার মধ্যে বিদ্যমান ইনক্যাপাবিলিটি ও তার ইনহারেন্ট উইকনেসগুলোকে রিকভার ও ফুলফিল করবে।

রুবায়েত: তাহলে তো দেখা গেলো, আমরা আমাদের ধারণা থেকে…

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমরা তো আমাদের মতো কল্পনা করছি। তাহলে তাঁর থেকে আমরা কীভাবে নিতে পারবো? আমরা আমাদের মতো করেই বড়জোর তাঁর থেকে নিতে পারবো। ওই যে আমি বলেছিলাম, ১০ এবং ১০০’র তুলনা। এখন ১০ ভাগওয়ালা তো ১০০ ভাগওয়াকে ১০০ ভাগ হিসেবে নিতে পারবে না। সে ১০০ ভাগওয়ালাকে নিজের মতো করে নিবে।

রুবায়েত: জ্বী, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমি তোমাকে আবার ওই কথাটা বলি। বিজ্ঞানীরা বলে, জগতের মধ্যে নাকি ইলেভেন ডাইমেনশন আছে। যেমন– আমরা দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা এই তিনটা ডাইমেনশনের সাথে পরিচিত। এরকম ইলেভেন ডাইমেনশন আছে। এখন ইলেভেন ডাইমেনশনে যদি কেউ একটা কিছু প্রেজেন্ট করে, তিন ডাইমেনশনওয়ালা একজন মানুষ হিসেবে আমি তো প্রেজেন্টেশনটি আমার মতো করেই দেখবো। ইলেভেন ডাইমেনশনওয়ালা প্রেজেন্টারের মতো করে কি আমি সেটা দেখতে পারবো?

রুবায়েত: না, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মনে করো, কেউ বিভিন্ন সাউন্ড রেঞ্জে কথা বললো। এখন আমি তো শুধুমাত্র সেই রেঞ্জের সাউন্ডগুলাকেই ক্যাচ করতে পারবো, যেগুলো আমার জন্য অডিবল। আর যেগুলো আমার কাছে অডিবল নয়, সেগুলো আমি ক্যাচ করতে পারবো না। তাই না? আমি বরং দাবি করবো, এখানে কোনো শব্দ নাই। সুনসান নীরবতা। তাই না?

তাহলে আসল সমস্যাটা হচ্ছে, আমাদের ভেরি একজিস্টেন্স নিয়ে। আমাদের ভেরি একজিস্টেন্সের যে রিয়েলিটি, সেটাকে যদি আমরা মেনে নিতে পারি তাহলে কিন্তু আমরা জগতের রিয়েলিটি এবং জগতের রিয়েলিটির আউট দেয়ার হিসেবে গডের রিয়ালিটিকেও আমাদের মতো লজিক্যালি কনসিসটেন্ট দেখতে পাবো।

লজিক্যালি কনসিসটেন্ট মানে, যেটার পক্ষেও লজিক আছে। হতে পারে এটার বিপক্ষেও লজিক আছে। এ ধরনের কাউন্টার-ব্যালেন্সড সিচুয়েশানে ব্যক্তি নিজের ইনটেনশনালিটি বা মন-মানসিকতা অনুসারে কোনো একটা পক্ষকে বেছে নিবে। তখন দিনশেষে বেছে নেয়া পক্ষাটাই তার জন্য একমাত্র গ্রহণযোগ্য পক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। এখানে নিয়তের ভূমিকাটা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তকারী বা ডিসাইসিভ হয়ে উঠে।

সমস্যা হলো, সাধারণত আলেম-উলামারা, আমাদের ইসলামিক লোকেরা বা ধর্মের লোকেরা বলবে– সব যুক্তি হচ্ছে ধর্মের পক্ষে, ধর্মের বিপক্ষে কোনো যুক্তি নাই। আর নাস্তিকেরা বলবে– সব যুক্তি হচ্ছে ধর্মের বিপক্ষে, ধর্মের পক্ষে কোনো যুক্তি নাই। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, logically we are counter-balanced. এখন আমার ইনটেনশন, ওই যে তোমাকে বলেছিলাম Inference to the best explanation (IBE), আমার সেই ইনফারেন্স দিয়ে আমি ঠিক করবো what is what.

[রুবায়েত, যার সাথে কথা বলেছি, তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়তো। আলোচনাটা হয়েছে অন্তত দু’বছর আগে। ওভার অ্যা ফোন কল। জুমার নামাজের জন্য বিরতি সহকারে, একটানা। ফোনের ভয়েস রেকর্ড হতে এটি ট্রান্সক্রিপ্ট করেছেন ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’র গবেষণা সহকারী জনাব মাসউদুল আলম ও জনাব আইয়ুব আলী।]

আপনার মন্তব্য/প্রশ্ন লিখুন

ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।

*